বড় অঙ্কের ঋণে অনিয়ম ও জালিয়াতি ঠেকাতে নতুন করে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পঞ্চাশ কোটি টাকা বা তার বেশি অঙ্কের ঋণ বিতরণের পর সেই অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে এখন থেকে বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক অডিট করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই অডিটের প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে জমা দিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই অডিটের মাধ্যমে মূলত তিনটি বিষয় খতিয়ে দেখা হবে— ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতেই ব্যবহার হয়েছে কি না, কোনো নির্দিষ্ট খাতের নামে ঋণ নিয়ে তা অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কি না, এবং ভুয়া বা বেনামি ঋণের মাধ্যমে কোনো অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে কি না। ব্যাংকিং পরিভাষায় এই ধরনের নজরদারিকে বলা হয় ‘এন্ড ইউজ মনিটরিং’ বা ঋণের চূড়ান্ত ব্যবহার তদারকি।
শিগগিরই এ সংক্রান্ত একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা জারি করে তা পরিপালনের নির্দেশ দেওয়া হবে দেশের সব ব্যাংককে। বহিঃনিরীক্ষকের প্রতিবেদনে কোনো অনিয়মের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, দেশে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো বেনামি ও ভুয়া ঋণের প্রবণতা। অনেক ক্ষেত্রে জামানতের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি দেখিয়ে ঋণ নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আবার ব্যবসায়িক প্রয়োজনের কথা বলে ঋণ নিয়ে তা দিয়ে জমি কেনা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ কিংবা বিদেশে পাচারের মতো অভিযোগও উঠে এসেছে। এসব অনিয়মের পেছনে কিছু ব্যাংকের পরিচালক ও কর্মকর্তার সরাসরি যোগসাজশ থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে বলে জানান তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ধারণা, একটি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ঋণের প্রকৃত ব্যবহার যাচাই করা গেলে এই ধরনের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। একইসঙ্গে এতে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা— উভয় পক্ষের জবাবদিহিতাও বাড়বে বলে তাদের বিশ্বাস।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই বড় অঙ্কের ঋণের ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে বড় ঋণ বিতরণের পর একটি স্বীকৃত হিসাব পরীক্ষক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণের ব্যবহার সংক্রান্ত প্রতিবেদন নেওয়ার নিয়ম চালু আছে। এমনকি ঋণের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সন্দেহ হলে সেখানে আরও গভীর পর্যায়ের ফরেনসিক অডিটও করানো হয়।
এই উদ্যোগের প্রস্তুতি হিসেবে বড় ঋণের অনিয়ম খুঁজে বের করতে ইতিমধ্যে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত মে মাসেই দেশের সব ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বিতরণ ও পুনঃতফসিল করা বিশ কোটি টাকা বা তার বেশি অঙ্কের ঋণের বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে, যার মধ্যে ছিল ঋণগ্রহীতার পরিচয়, ঋণের খাত এবং পুনঃতফসিল সংক্রান্ত তথ্য।
এই তথ্য যাচাই করতে গিয়ে ইতিমধ্যে কয়েকটি ব্যাংকে অনিয়মের প্রমাণও পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে বেনামি ঋণের ঘটনা এবং পর্যাপ্ত ডাউনপেমেন্ট বা জামানত ছাড়াই বড় অঙ্কের ঋণ পুনঃতফসিল করার বিষয়টি সামনে এসেছে। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে সতর্ক করে চিঠিও পাঠানো হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্যমতে, বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাত একটি বৈপরীত্যপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে— একদিকে বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোতে উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়ছে, অন্যদিকে খেলাপি ও দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণও ক্রমাগত বাড়ছে। গত জুন মাস শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ রেকর্ড ছুঁয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় চার লাখ আট হাজার কোটি টাকায়, অথচ একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার নেমে এসেছে মাত্র সাড়ে চার শতাংশের কাছাকাছি।
অন্যদিকে গত বছরের শেষ নাগাদ দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় দশ লাখ সাতাশি হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ষাট শতাংশের কাছাকাছি— একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান। এই বাস্তবতায় নতুন করে ঋণের মান আরও খারাপ হওয়া ঠেকাতে ঋণ ব্যবহারের পর্যায়ে কড়া নজরদারি বাড়ানোর এই উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বাধ্যতামূলক অডিট ব্যবস্থা চালু হলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে বাস্তবায়নের কঠোরতা এবং অনিয়ম ধরা পড়লে প্রকৃত অর্থে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, তার ওপর।

