দেশে ব্যাংকিং সেবায় ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড—এই তিন ধরনের ব্যাংকিং কার্ডের মোট সংখ্যা প্রথমবারের মতো ৫ কোটি অতিক্রম করেছে। একই সঙ্গে গত পাঁচ বছরে কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা নগদবিহীন অর্থনীতির দিকে দেশের অগ্রযাত্রার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রকাশিত সর্বশেষ কার্ড ব্যবহারসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড—সব মিলিয়ে মোট ব্যাংকিং কার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ১০ লাখ ৯১ হাজার ১৬টি। এর মধ্যে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে দেশে ডেবিট কার্ড রয়েছে ৩ কোটি ৯৭ লাখ ৪৭ হাজার ৮০১টি, যা ২০২১ সালের জুন মাসের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি।
শুধু কার্ডের সংখ্যাই নয়, বেড়েছে এর ব্যবহারও। ২০২১ সালের জুনে ডেবিট কার্ডে মোট লেনদেন হয়েছিল ২১ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। চলতি বছরের মে মাসে সেই লেনদেন বেড়ে ৫৫ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে ডেবিট কার্ডে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ১৫৮ শতাংশ।
ডেবিট কার্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকটির ইস্যু করা ডেবিট কার্ডের সংখ্যা ১ কোটি ৪৪ লাখ ৫০ হাজার ১৫২টি।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, যার ডেবিট কার্ডের সংখ্যা ৬৯ লাখ ৫৫ হাজার ২১০টি। এরপর পর্যায়ক্রমে রয়েছে পূবালী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া এবং ট্রাস্ট ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ডেবিট কার্ডের প্রায় ৭৭ শতাংশ এই শীর্ষ ১০টি ব্যাংকের মাধ্যমে ইস্যু করা হয়েছে। অন্যদিকে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর ইস্যু করা ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ২৬ লাখ ৪৯ হাজার ৮৫১টি। এছাড়া একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরও ৯২ হাজার ১৯৮টি ক্রেডিট কার্ড চালু রয়েছে।
ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালের জুনে যেখানে মোট লেনদেন ছিল প্রায় ১ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৬ সালের মে মাসে তা বেড়ে ৪ হাজার ৬১৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
ক্রেডিট কার্ড ইস্যুর দিক থেকে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে সিটি ব্যাংক পিএলসি। অ্যামেরিকান এক্সপ্রেস কার্ডের বাংলাদেশে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ব্যাংকটির ইস্যুকৃত ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ৩ লাখ ৬১ হাজার ৩৯২টি।
এরপর রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক (৩ লাখ ৬ হাজার ৭৩৪টি), ইস্টার্ন ব্যাংক (২ লাখ ২৯ হাজার ৯০১টি), ডাচ্-বাংলা ব্যাংক (১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪৮টি) এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (১ লাখ ৭৩ হাজার ২৬২টি)।
শীর্ষ দশে আরও রয়েছে সাউথইস্ট ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক এবং ব্যাংক এশিয়া।
প্রিপেইড কার্ডের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ব্যাংকটির ইস্যু করা প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা ৭৪ লাখ ৮৭ হাজার ২৩টি। বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা ৮৬ লাখ ১ হাজার ১৬৬টি।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামোর সম্প্রসারণ, ই-কমার্সের প্রসার, মোবাইল ও অনলাইনভিত্তিক সেবার ব্যবহার বৃদ্ধি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কারণে ব্যাংকিং কার্ডের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
তাদের মতে, কার্ডভিত্তিক লেনদেন যত বাড়বে, ততই নগদ অর্থের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে, আর্থিক লেনদেন আরও স্বচ্ছ হবে এবং ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে আধুনিক ও ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জনেও এ প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

