২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংক খাতে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর দেশের ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে গ্রাহকদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করে। সেই আস্থার প্রতিফলন দেখা যায় আমানত প্রবৃদ্ধিতেও। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে এসব ব্যাংকে আমানত বাড়লেও মে মাসে সেই ইতিবাচক ধারা হঠাৎ করেই থেমে যায়।
বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান নিয়োগকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক ও অনিশ্চয়তার প্রভাব পুরো খাতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে দেশের ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক থেকে এক মাসের ব্যবধানে ২ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা আমানত কমে গেছে। এতে দীর্ঘদিন পর ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতে বড় ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিল শেষে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৮ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। কিন্তু মে মাস শেষে সেই পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৬ হাজার ১৪১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক মাসেই এসব ব্যাংকের আমানত ২ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা কমেছে।
তবে সামগ্রিক ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার চিত্র কিছুটা ভিন্ন। কারণ প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামিক শাখা ও ইসলামিক উইন্ডোতে একই সময়ে আমানত বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিকভাবে আমানত কমার পরিমাণ তুলনামূলক সীমিত ছিল। এপ্রিল শেষে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। মে মাস শেষে তা কমে ৪ লাখ ৮০ হাজার ৪১ কোটি টাকায় নেমে আসে। ফলে পুরো ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এক মাসে মোট আমানত কমেছে ৭৫৮ কোটি টাকা।
ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়মের অভিযোগে আলোচিত একজন ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় অনেক আমানতকারী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় পড়েন। এর প্রভাবেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রাহক তাদের আমানত তুলে নেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং খাতে গ্রাহকের আস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কোনো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পুরো খাতের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ভবিষ্যতে বিতর্কিত নিয়োগ এড়িয়ে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হলে গ্রাহকদের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে বলে তারা মনে করছেন।
অন্যদিকে, আমানত কমলেও প্রবাসী আয় সংগ্রহে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক, প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামিক শাখা এবং ইসলামিক উইন্ডোর মাধ্যমে দেশে ৬২ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আসে। মে মাসে সেই পরিমাণ বেড়ে ৬৫ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। অর্থাৎ এক মাসে প্রবাসী আয় ৩ কোটি ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে বৈদেশিক বাণিজ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এপ্রিল মাসে ১২৩ কোটি মার্কিন ডলারের আমদানি বিল পরিশোধ করা হলেও মে মাসে তা কমে ৮৯ কোটি ডলারে নেমে আসে। ফলে এক মাসে আমদানি বিল পরিশোধ ৩৪ কোটি ডলার কমেছে।
একই সময়ে রপ্তানি আয়েও উল্লেখযোগ্য হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে। এপ্রিল মাসে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ৭১ কোটি মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় দেশে এলেও মে মাসে তা কমে দাঁড়ায় ৫৭ কোটি মার্কিন ডলারে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে রপ্তানি আয় ১৪ কোটি ডলার কমেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইসলামি ব্যাংকিং খাতে আমানত, বৈদেশিক বাণিজ্য ও প্রবাসী আয়ের মতো সূচকগুলো দেশের আর্থিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বিতর্কমুক্ত ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে পারলে খাতটি আবারও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে পারে।
সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন।

