দেশের ব্যাংক খাতে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলা খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে গেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। খেলাপি ঋণের হার বেশি থাকা ২৯টি ব্যাংকের জন্য পৃথক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে আগামী ছয় মাসের মধ্যে তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট খেলাপি ঋণ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির (এএমসি) কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত ধাপে ধাপে ২৯টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। এসব বৈঠকে প্রতিটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অবস্থা পর্যালোচনা করে বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ফল দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার বর্তমানে ২০ শতাংশের বেশি, তাদের আগামী ছয় মাসের মধ্যে তা ২০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে হবে। অন্যদিকে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, তাদের সেই হার ১০ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করে জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে অনাদায়ী ঋণ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করতে হবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে আদায়যোগ্য নয় এমন ঋণ আলাদা ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে পুনরুদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে গভর্নর ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের নতুন করে খেলাপি ঋণ সৃষ্টি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে পুনঃতফসিল করা ঋণের ওপর নিবিড় নজরদারি, বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে বকেয়া অর্থ আদায়ে বিশেষ উদ্যোগ এবং কৃষি ও ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতের গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া টক্সিক বা উচ্চঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ব্যালান্সশিটে রেখে অনাদায়ী সুদকে আয় হিসেবে দেখিয়ে লভ্যাংশ বিতরণ না করার বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন নিশ্চিত করতে এ ধরনের হিসাব পদ্ধতি পরিহার করা প্রয়োজন।
দীর্ঘদিন ধরে পুনঃতফসিল হওয়া ঋণ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর), এক্সিট সুবিধা অথবা প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে শ্রেণিকৃত অবস্থায় থাকা ঋণ নীতিমালা অনুযায়ী অবলোপনের উদ্যোগ গ্রহণ এবং বিদ্যমান বিধিবিধানের মধ্য থেকেই খেলাপি ঋণ কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপরও জোর দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন মূলধন সংগ্রহ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ২৯টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি ছিল। এর মধ্যে ব্যাংক অব পাকিস্তান, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার বিশেষভাবে উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এটি বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা, যা পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
ব্যাংক খাত বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণ কমাতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও শুধু সময়সীমা বেঁধে দিলেই কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ আদায়, কার্যকর আইনি ব্যবস্থা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় খেলাপি ঋণের চাপ ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ও অর্থনীতির ওপর আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

