দেশের ব্যাংক খাতে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যক্তি শ্রেণীর হিসাবের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের সময়ে এমন ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৭ হাজারের বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ সময়ে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা প্রায় ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে ব্যক্তি শ্রেণীর ১ কোটি টাকা বা তার বেশি আমানত থাকা হিসাব ছিল ৩৩ হাজার ৬২৯টি। দেড় বছর পর ২০২৬ সালের মার্চে এসে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৬৪৫টিতে অর্থাৎ এই সময়ে নতুন করে ৭ হাজার ১৬টি কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব যুক্ত হয়েছে। হিসাবের দিক থেকে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। এরপর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে শেষ হয় ওই সরকারের মেয়াদ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যক্তিগত হিসাব ছিল ৩৩ হাজারের ঘরে। কিন্তু সরকারের মেয়াদ শেষে তা ৪০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
শুধু হিসাবের সংখ্যাই নয়, এসব হিসাবে থাকা আমানতের পরিমাণও বেড়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবগুলোতে মোট জমা ছিল প্রায় ৮৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯১ হাজার ৪০০ কোটি টাকায়।
অর্থনীতির স্থবিরতার মধ্যেও কেন বাড়ল কোটিপতি হিসাব?
অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যখন গতি কম ছিল, মূল্যস্ফীতির চাপ ছিল এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছিল, তখন কোটি টাকার ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা এভাবে বাড়া স্বাভাবিক প্রবণতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণে নতুন কিছু গোষ্ঠীর উত্থান, ব্যাংক খাতে আস্থার পরিবর্তন এবং অর্থের স্থানান্তর—এসব বিষয় এ বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের কাঠামো বদলে যায়। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন অংশগ্রহণকারী তৈরি হয়। এর প্রভাব ব্যাংক হিসাব বৃদ্ধিতেও পড়তে পারে। তার মতে, ওই সময়ে নতুন করে তৈরি হওয়া কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ব্যক্তিদের কারণে কোটি টাকার হিসাব বৃদ্ধির বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
নতুন অর্থশালী গোষ্ঠীর উত্থানের ইঙ্গিত?
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও নানা আলোচনা ছিল। পুলিশের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ ছিল নতুন মুখ। তাদের বিরুদ্ধে আগে একই ধরনের অপরাধের রেকর্ড ছিল না।
আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু নতুন গোষ্ঠী দ্রুত অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে কি না, সেটিও অনুসন্ধানের বিষয়। তবে কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বৃদ্ধির পেছনে শুধু নতুন অর্থের মালিক তৈরি হওয়াকেই একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না অনেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাতের পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণেও এ ধরনের হিসাব বাড়তে পারে।
তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন করা হয়। দুর্বল ব্যাংক থেকে অনেক গ্রাহক অর্থ তুলে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা ব্যাংকে জমা করেছেন। বিশেষ করে বড় অঙ্কের স্থায়ী আমানত ভেঙে নতুন ব্যাংক হিসাবে রাখার কারণেও কোটি টাকার হিসাব বেড়ে থাকতে পারে। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নজরদারি বাড়ার কারণে অনেকে ঘরে নগদ টাকা না রেখে ব্যাংকে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েও থাকতে পারেন।

