আমদানি ব্যয় পরিশোধে ডলারের চাহিদা বাড়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আবারও চাপ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আন্তঃব্যাংক বাজার ও রেমিট্যান্স উৎস থেকে নির্দিষ্ট দামের বেশি দরে ডলার না কেনার মৌখিক নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপ বাজারে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। ব্যাংকারদের একাংশ বলছেন, এতে বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নীতির সঙ্গে এমন নির্দেশের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ব্যাংক খাতের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে মৌখিকভাবে জানিয়েছে, আন্তঃব্যাংক বাজার এবং রেমিট্যান্স চ্যানেল—উভয় ক্ষেত্রেই ১২৩ টাকা ৮২ পয়সার বেশি দরে ডলার কেনা যাবে না।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা। তাদের ভাষ্য, আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দর প্রায় ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা থাকলেও রেমিট্যান্সের ডলার সংগ্রহ করতে ব্যাংকগুলোকে ১২৩ টাকা ৯০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সীমার মধ্যে লেনদেন করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হচ্ছে না।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, আন্তঃব্যাংক বাজার মূলত চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ার কথা। সেখানে প্রশাসনিকভাবে সর্বোচ্চ দর নির্ধারণ করে দিলে অনেক ব্যাংক লেনদেনে আগ্রহ হারায়। এতে বাজারের তারল্য কমে যাওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়াও ব্যাহত হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলারের বিনিময় হার অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার মতে, বাজারে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা এবং বিনিময় হার নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোও এ উদ্যোগের একটি উদ্দেশ্য।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের বড় একটি অংশ মনে করেন, বিনিময় হারকে প্রশাসনিকভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল নাও দিতে পারে। তাদের মতে, কৃত্রিমভাবে দাম আটকে রাখলে প্রকৃত বাজারদর প্রতিফলিত হয় না এবং বিকল্প বা অনানুষ্ঠানিক বাজারে দামের ব্যবধান আরও বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে আরও বাজারভিত্তিক করার পরামর্শ দিয়ে আসছে। তাদের মতে, ডলারের মূল্য নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপ যত কম হবে, বাজার তত বেশি কার্যকরভাবে কাজ করবে।
জুনের শেষ দিক থেকে ডলারের বিনিময় হার ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। সোমবার বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক আমদানির ঋণপত্রের দায় পরিশোধে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সা পর্যন্ত মূল্য দিয়েছে বলে ব্যাংক খাতের সূত্র জানিয়েছে।
চলতি মাসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের একটি প্রতিনিধিদল নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা করতে ঢাকা সফর করেছে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, নতুন কর্মসূচিতেও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার বজায় রাখা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে থাকতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের মতে, মৌখিকভাবে ডলারের দর নির্ধারণ করলে বাজারে বিভ্রান্তিকর বার্তা যায়। তিনি বলেন, বাজারকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া উচিত। ডলারের মূল্য কিছুটা বাড়লেও সেটি যদি চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে বাজার আরও স্থিতিশীল হবে।
তার মতে, প্রশাসনিকভাবে দর নিয়ন্ত্রণের ফলে ব্যাংকিং চ্যানেল ও অনানুষ্ঠানিক বা কার্ব মার্কেটের দামের ব্যবধান বেড়ে যেতে পারে। এতে বৈধ পথে বৈদেশিক মুদ্রা আসার প্রবণতাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে সরকারি আমদানির ঋণপত্রের বিপরীতে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে স্বল্প সময়ের জন্য ডলারের চাহিদা বেড়েছে এবং বাজারে চাপ অনুভূত হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থনৈতিক সূচক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঋণপত্রের মাধ্যমে আমদানি দায় নিষ্পত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৭০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, আমদানি দায় পরিশোধে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ০৯ শতাংশ।
এদিকে জুন মাসে দেশে প্রবাসী আয়ও গত আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ প্রত্যাশার তুলনায় কমেছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে ডলারের প্রবেশের তুলনায় বহির্গমন বেশি হওয়ায় বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর মধ্যে ডলার সংগ্রহের প্রতিযোগিতাও বেড়েছে।
টাকার বিনিময় হার শক্তিশালী হওয়ার চাপের মধ্যে গত প্রায় দেড় মাস ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কেনা বন্ধ রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার কিনেছিল। সর্বশেষ গত ৪ জুন বাজার থেকে ডলার ক্রয় করা হয়।
ব্যাংক খাতের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মতে, ২০২২ সালের শেষ দিকে ডলারের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার অভিজ্ঞতা এখনো প্রাসঙ্গিক। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাজারের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। অন্যথায় সাময়িকভাবে বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে বাজারে আরও বড় চাপ ও অস্থিরতার কারণ হতে পারে।

