আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেন আরও সহজ, নিরাপদ ও আধুনিক করতে নতুন ব্যাংক-ইন্টারমিডিয়েটেড ডিজিটাল পেমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের অনুমোদিত ব্যাংকগুলো বিদেশি ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বৈদেশিক লেনদেনের সেবা দিতে পারবে। এতে ফ্রিল্যান্সার, ই-কমার্স উদ্যোক্তা, রপ্তানিকারক এবং আন্তর্জাতিক লেনদেননির্ভর গ্রাহকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
বুধবার জারি করা এক সার্কুলারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলো বিদেশি ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ও অর্থ লেনদেন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা করে আন্তসীমান্ত বা ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল লেনদেন পরিচালনা করতে পারবে। এসব প্রতিষ্ঠানকে সম্মিলিতভাবে ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় গ্রাহকদের জন্য ডিজিটাল ভ্যালু অ্যাকাউন্ট (ডিভিএ) চালুর সুযোগ রাখা হয়েছে। এটি মূলত একটি ডিজিটাল ওয়ালেট বা সংরক্ষিত অর্থের হিসাব হিসেবে কাজ করবে।
তবে এসব অ্যাকাউন্ট স্বাধীনভাবে পরিচালিত হবে না। প্রতিটি ডিভিএ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি মাস্টার ডিভিএ-এর সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। এর ফলে ব্যাংকগুলো সব লেনদেন পর্যবেক্ষণ করতে পারবে এবং নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই ডিজিটাল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ব্যক্তিগত, চিকিৎসা এবং সরকারি ভ্রমণ-সংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় নির্বাহ করা যাবে।
এ ছাড়া সদস্যপদ ফি, তথ্যপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট সেবার মূল্য পরিশোধ, ভিসা ফি, অনলাইনে হোটেল বুকিংসহ বিভিন্ন অনুমোদিত আন্তর্জাতিক ব্যয়ও এ ব্যবস্থার আওতায় করা যাবে। সীমিত পরিসরে আন্তর্জাতিক ই-কমার্স লেনদেনও এই ডিজিটাল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সম্পন্ন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থাটি এক্সপোর্ট রিটেনশন কোটা এবং রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট (আরএফসিডি) হিসাবের বিপরীতেও প্রযোজ্য হবে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এর ফলে রপ্তানিকারক, তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার এবং ই-কমার্স খাতের আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেন আরও সহজ ও দ্রুত হবে। বিদেশ থেকে আয় গ্রহণ, সেবা বাবদ অর্থ পরিশোধ এবং বৈদেশিক ব্যবসায়িক লেনদেনের প্রক্রিয়াও আগের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর হবে।
এই সেবা চালুর আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন নিতে হবে। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পরিচালন কাঠামো যাচাইয়ের পরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুমতি দেবে। একই সঙ্গে অর্থ পাচার প্রতিরোধ, গ্রাহকের পরিচয় যাচাই এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সব বিধি-বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন ডিজিটাল পেমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক দেশের ডিজিটাল আর্থিক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এতদিন ব্যাংকগুলো মূলত অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে বিদেশ থেকে অর্থ গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন নীতিমালার ফলে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই কাঠামো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায় নতুন গতি আসবে। পাশাপাশি পেপ্যাল, স্ট্রাইপসহ বৈশ্বিক ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর বাংলাদেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগকে দেশের বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পাশাপাশি ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

