দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম বড় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ চলতি বছরের প্রথমার্ধে নজিরবিহীন আর্থিক ধাক্কার মুখে পড়েছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ব্যাংকটির সমন্বিত লোকসান দাঁড়িয়েছে এক হাজার তিনশ ষোলো কোটি ৪৮ লাখ টাকায়, যেখানে ঠিক আগের বছরের একই সময়ে ব্যাংকটি ছিল মুনাফার ধারায়।
হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে ব্যাংকটির সমন্বিত মুনাফা হয়েছিল সাতষট্টি কোটি ৪০ লাখ টাকা। সেই তুলনায় এবারের লোকসান পুরো পরিস্থিতিকে উল্টে দিয়েছে। ২০২৬ সালের জুন শেষে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান গিয়ে ঠেকেছে আট টাকা দশ পয়সায়। বুধবার প্রধান কার্যালয়ে পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক শেষে এই আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিগত পাঁচ বছর ধরে ইসলামী ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে মুনাফায় ছিল। ২০২৫ সালে মুনাফা হয়েছিল একশ ছত্রিশ কোটি টাকার বেশি, ২০২৪ সালে একশ আট কোটির বেশি এবং ২০২৩ সালে সবচেয়ে বেশি, ছয়শ পঁয়ত্রিশ কোটি টাকার বেশি। এই ধারাবাহিক মুনাফার প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের লোকসান ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
প্রান্তিকভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, বছরের শুরুতেই অর্থাৎ প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকটি প্রায় দুইশ আটাশি কোটি টাকা লোকসান করেছিল। এরপর দ্বিতীয় প্রান্তিকে অর্থাৎ এপ্রিল-জুন সময়ে লোকসানের পরিমাণ আরও বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার আটাশ কোটি টাকার বেশি। সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে শুধু মূল ব্যাংকের হিসাবে ছয় মাসে লোকসান দাঁড়িয়েছে এক হাজার তিনশ ছাব্বিশ কোটি টাকার বেশি, শেয়ারপ্রতি যার পরিমাণ আট টাকা চব্বিশ পয়সা।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই লোকসানের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করেছে—আমানতকারীদের মুনাফা পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি, খেলাপি বিনিয়োগ বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যাওয়া এবং অন্য ব্যাংকে রাখা অর্থ থেকে আয় হ্রাস।
ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, ব্যাংকের সম্পদের একটি বড় অংশ একটি বড় শিল্প গোষ্ঠী অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ হিসেবে সরিয়ে নিয়েছে, যেখান থেকে কোনো অর্থ ফেরত আসছে না। অথচ আমানতকারীদের নিয়মিতভাবে মুনাফা দিতে হচ্ছে। তাঁর ভাষ্যমতে, ব্যাংকের মোট আমানত বর্তমানে প্রায় এক লাখ বাষট্টি হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে মাত্র ষাট হাজার কোটি টাকার মতো অংশ থেকে অর্থ আদায়যোগ্য অবস্থায় আছে। বাকি প্রায় এক লাখ কোটি টাকার সিংহভাগই ওই ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংকট মোকাবিলার সম্ভাব্য পথ হিসেবে তিনি জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের উদ্যোগ নিচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠান যদি মন্দ সম্পদগুলো কিনে নেয়, অথবা বিশেষ নির্দেশনার মাধ্যমে সমস্যাযুক্ত ঋণকে ব্যালান্স শিট থেকে পৃথক রাখার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে ব্যাংকের বর্তমান সংকট কেটে যেতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকে প্রায় পাঁচশ কোটি টাকার নতুন আমানত এসেছে এবং নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হলে গ্রাহকের আস্থা আরও বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।
এ বিষয়ে ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, একটি বড় শিল্প গোষ্ঠীতে ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ থাকলেও সেখান থেকে কোনো আয় আসছে না, অথচ এই বিনিয়োগ করা হয়েছিল আমানতকারীদের অর্থ দিয়েই। ফলে একদিকে আয় বন্ধ, অন্যদিকে আমানতকারীদের নিয়মিত মুনাফা পরিশোধের চাপ—এই দ্বিমুখী চাপেই লোকসান তৈরি হয়েছে বলে তিনি ব্যাখ্যা দেন। তিনি আরও জানান, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হওয়ায় আদায় না হওয়া অর্থকে আয় হিসেবে না দেখিয়ে সাসপেন্স হিসাবে রাখা হচ্ছে, এবং ভবিষ্যতে এই অর্থ আদায় হলে ব্যাংকের মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।
সম্পদের মান খারাপ হওয়ার প্রভাব শুধু ইসলামী ব্যাংকেই সীমাবদ্ধ নেই। আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসিও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সমন্বিতভাবে এক হাজার ছয়শ আটষট্টি কোটি ২৪ লাখ টাকা লোকসানের মুখে পড়েছে। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকের পর প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান বেড়ে আট টাকা আটষট্টি পয়সায় পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল পাঁচ টাকা সাতাশি পয়সা।
দ্বিতীয় প্রান্তিকেও পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত থাকে। এপ্রিল-জুন সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়ায় চার টাকা কুড়ি পয়সা, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল তিন টাকা সাতাশ পয়সা। ধারাবাহিক লোকসানের প্রভাবে ব্যাংকটির সম্পদভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত হিসাবে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ঋণাত্মক তিন টাকা ঊনসত্তর পয়সায় নেমে এসেছে, যেখানে এক বছর আগে এই মূল্য ছিল ইতিবাচক, বারো টাকা চৌত্রিশ পয়সা।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, পরিচালন লোকসান বৃদ্ধি ও সম্পদের মান উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হওয়ার কারণেই শেয়ারপ্রতি আয় ও নগদ প্রবাহে এই বড় পতন ঘটেছে।
দুটি ব্যাংকের এই লোকসানের চিত্র ব্যাংক খাতের একটি বড় দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করে—নির্দিষ্ট কিছু বড় গ্রাহকের কাছে অতিরিক্ত ঋণ কেন্দ্রীভূত থাকা এবং সেই ঋণ থেকে অর্থ আদায়ে ব্যর্থতা। আমানতকারীদের নিয়মিত মুনাফা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বজায় থাকলেও বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আয় না আসায় ব্যাংক দুটির আর্থিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ, বিশেষ করে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের উদ্যোগ, এই সংকট নিরসনে কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি ও স্বচ্ছতার ওপর।

