মূলধন সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে না পারায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে পরিচালিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের শাখাগুলো বন্ধের প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশ দিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যে একজন প্রশাসক নিয়োগের শর্ত বেঁধে দেওয়া হয়েছে এ প্রক্রিয়া তদারকির জন্য।
গত ১৫ জুলাই আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে একটি চিঠি পাঠানো হয় জনতা ব্যাংকের ইউএই শাখার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে। এতে শাখা গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। চিঠি পাওয়ার পর তিনি বিষয়টি জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠিয়ে করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা চান।
নির্দেশনা অনুযায়ী, চিঠি ইস্যুর তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ১৫ আগস্টের মধ্যে একজন যোগ্য প্রশাসক নিয়োগ করতে হবে জনতা ব্যাংককে।
১৯৭৬ সাল থেকে আরব আমিরাতে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে জনতা ব্যাংক। বর্তমানে আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ ও আল আইন—এই চারটি শহরে ব্যাংকটির শাখা রয়েছে, যেগুলো মূলত প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স সেবা, আমানত গ্রহণ এবং বাণিজ্য অর্থায়নের মতো ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
আরব আমিরাতের নিয়ম অনুযায়ী, দেশটিতে ব্যাংক পরিচালনার জন্য জনতা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন থাকার কথা চারশ মিলিয়ন দিরহাম। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকটির প্রকৃত মূলধন রয়েছে মাত্র একশ মিলিয়ন দিরহাম। অর্থাৎ ঘাটতির পরিমাণ প্রায় তিনশ মিলিয়ন দিরহাম, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার সমান।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি আগেই সতর্ক করেছিল যে পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ করা না হলে গ্রাহকদের আমানত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, এবং সে কারণেই কার্যক্রম বন্ধের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। এর আগে জুলাইয়ের শুরুতে পাঠানো এক চিঠিতেও জনতা ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি ও মূলধন সংক্রান্ত শর্ত ভঙ্গ নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছিল। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে চিঠি চালাচালি চলছিল এপ্রিল ও মে মাস থেকেই।
নির্দেশনা অনুযায়ী, নিয়োগের আগে প্রশাসকের নাম আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে। নিয়োগ পাওয়ার পর তাঁকে ব্যাংকের সব দায়দেনা মিটিয়ে ফেলা, ঋণ ও অন্যান্য দায় সমন্বয় করা, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ধাপে ধাপে বন্ধ করার পাশাপাশি শাখাগুলোর কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে গুটিয়ে নেওয়ার একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
এই পুরো প্রক্রিয়ার জন্য সর্বোচ্চ তিন বছর সময় বেঁধে দেওয়া যাবে, এবং সেই পরিকল্পনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পর্যালোচনার জন্য জমা দিতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত বিরতিতে অগ্রগতি, সমস্যা ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবহিত করতে হবে প্রশাসককে। সাপ্তাহিক ভিত্তিতে নির্দিষ্ট ছকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট করেসপন্ডেন্ট ব্যাংক ও ব্যবসায়িক অংশীদারদেরও শাখা বন্ধের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করতে বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগেও আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জনতা ব্যাংকের চারটি শাখার ওপর একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল—নতুন হিসাব খোলা বন্ধ রাখা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখা অর্থ থেকে উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা আরোপসহ প্রয়োজনীয় মূলধন সরবরাহ না করলে ধাপে ধাপে কার্যক্রম বন্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, শুরুতে আরব আমিরাতে ব্যাংকের শাখাগুলোর জন্য নির্ধারিত পরিশোধিত মূলধন ছিল মাত্র চল্লিশ মিলিয়ন দিরহাম, যা ২০২১ সালে বাড়িয়ে চারশ মিলিয়ন দিরহাম করা হয়। তিনি জানান, চারটি শাখাই লাভজনকভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে এবং সেই মুনাফার অর্থ থেকেই ধীরে ধীরে মূলধন ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছিল। তবে এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা একবারে পুরো মূলধন জমা দেওয়ার শর্ত দিচ্ছে, যার পেছনে কিছুটা ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও থাকতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও জানান, বিষয়টি ইতিমধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে অবহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিজেও আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে এ বিষয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। তাঁর প্রত্যাশা, আরও কিছুটা সময় পাওয়া যাবে এবং সরকারি সহায়তায় বাকি মূলধন জোগাড় করে একটি সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
এই ঘটনা প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক শাখা পরিচালনায় নিয়ন্ত্রক শর্ত মেনে চলার গুরুত্ব সামনে নিয়ে এসেছে। মূলধন সরবরাহের বিলম্ব শুধু একটি ব্যাংকের বিদেশি কার্যক্রমকেই ঝুঁকিতে ফেলছে না, বরং সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশি প্রবাসীদের ব্যাংকিং সেবা প্রাপ্তিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী দিনগুলোয় সরকারি হস্তক্ষেপ ও কূটনৈতিক যোগাযোগ এই সংকট সমাধানে কতটা কার্যকর হয়, তা নজরে রাখার মতো একটি বিষয়।

