জরুরি প্রয়োজনে এখন থেকে সর্বোচ্চ দশ লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবেন একীভূত হতে যাওয়া পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংকের গ্রাহকরা। শুধু চিকিৎসা নয়, পরিবারের অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনেও এখন এই সুবিধা মিলবে।
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক—একীভূত হয়ে একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করতে যাওয়া এই পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্যই প্রযোজ্য হবে নতুন এই নিয়ম।
এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় আমানতকারীরা শুধু নিজেদের চিকিৎসা ব্যয়ের জন্যই টাকা তোলার সুযোগ পেতেন। নতুন সিদ্ধান্তে সেই পরিধি বাড়িয়ে বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান কিংবা ভাই-বোনের চিকিৎসার খরচের পাশাপাশি অন্য যেকোনো জরুরি প্রয়োজনেও অর্থ তোলার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বহু আমানতকারী চিকিৎসার বাইরেও পারিবারিক প্রয়োজন কিংবা অন্যান্য জরুরি খাতে নিজেদের জমানো টাকা ব্যবহারের সুযোগ চেয়ে আসছিলেন। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই নীতিমালায় এই সংশোধন আনা হয়েছে।
এ ছাড়া পরিচালনা পর্ষদের সভায় আমানতের মুনাফায় প্রযোজ্য হেয়ারকাট বা কর্তন ব্যবস্থাও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। এর ফলে আমানতকারীরা এখন শরিয়াহভিত্তিক নিয়ম অনুযায়ী পুরো মুনাফাই পাবেন।
তিনি আরও জানান, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যেই পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে। এরপর এসব ব্যাংকে নিয়োজিত প্রশাসক দলও প্রত্যাহার করা হবে।
সাবেক সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক অনিয়ম ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণের কারণে এই পাঁচ ব্যাংক কার্যত আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ে। গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ধাপে ধাপে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার একটি কর্মসূচি চালু করে।
একীভূত হতে যাওয়া নতুন ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে পঁয়ত্রিশ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে সরকার দিচ্ছে বিশ হাজার কোটি টাকা। বাকি পনেরো হাজার কোটি টাকার বিপরীতে আমানতকারীদের শেয়ার প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স তহবিল থেকে প্রতিটি আমানতকারীকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে, আর অবশিষ্ট অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পৃথক একটি কর্মসূচির মাধ্যমে ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত এই কর্মসূচির আওতায় আট লাখ বাইশ হাজারের বেশি আমানতকারীকে মোট প্রায় তিন হাজার আটশ সাতাশি কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই পাঁচ ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় এক লাখ পঁচানব্বই হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে মাত্র সাড়ে সাতচল্লিশ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ পঁচিশ শতাংশেরও কম ঋণের বিপরীতে যথাযথ জামানত রাখা হয়েছিল। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ সত্তর হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় সাতাশি শতাংশ।
আমানতকারীদের জন্য অর্থ উত্তোলনের পরিধি বাড়ানো এবং মুনাফা কর্তন স্থগিত করার এই সিদ্ধান্ত ভুক্তভোগী গ্রাহকদের জন্য স্বস্তির খবর হলেও, ঋণের বিপরীতে জামানতের এই নিম্নহার এবং খেলাপি ঋণের বিশাল অঙ্ক স্পষ্ট করে দেয় যে সংকট থেকে পূর্ণ উত্তরণের পথ এখনো দীর্ঘ। একীভূতকরণ প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ে শেষ হলেও নতুন ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।

