দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে ‘বাংলা কিউআর’ পদ্ধতিতে দৈনিক লেনদেনের অঙ্ক তিনগুণ বেড়ে ১১০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী এই প্রবৃদ্ধির গতি রীতিমতো নজরকাড়া, যা দেশকে নগদবিহীন অর্থনীতির পথে এগিয়ে নিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল আর্থিক কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক চালু করে এই একক কিউআর কোড ব্যবস্থা। আগে প্রতিটি ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আলাদা কিউআর কোড থাকায় গ্রাহক ও ব্যবসায়ী উভয়কেই নানা জটিলতায় পড়তে হতো। এই সমস্যার সমাধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব প্রতিষ্ঠানকে একই মানের আওতায় এনে ‘বাংলা কিউআর’ নামে একটি অভিন্ন পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করে। চলতি বছরের জুলাই মাসের শুরু থেকে দেশের সব ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান তাদের পুরোনো কিউআর কোড বাদ দিয়ে এই নতুন ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে লেনদেনের সংখ্যা ও অঙ্ক দুই ক্ষেত্রেই। জুলাই মাসের শুরুর দিকে দৈনিক গড়ে প্রায় এক লাখ আটাত্তর হাজার লেনদেন হতো, যার আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় সাঁইত্রিশ কোটি টাকা। গত সপ্তাহের হিসাব বলছে, এখন প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন লাখ তিন হাজার লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে, আর এর আর্থিক মূল্য দাঁড়িয়েছে ১১০ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ লেনদেনের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ এবং আর্থিক মূল্য প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে।
শুধু লেনদেনের অঙ্ক নয়, এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বিক্রেতা বা মার্চেন্ট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে প্রায় ষোলো লাখ মার্চেন্ট এই সেবার আওতায় ছিল, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ত্রিশ লাখে। এতে বোঝা যায়, শুধু বড় শহরকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান নয়, ছোট ছোট দোকান ও ব্যবসায়ীরাও ধীরে ধীরে এই ডিজিটাল পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
এই সাফল্যের পেছনে মূল কারণ হিসেবে বিশ্লেষকেরা দেখছেন ‘এক দেশ এক কিউআর’ নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন। আগে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আলাদা কিউআর কোড থাকায় একজন গ্রাহককে একাধিক অ্যাপ ব্যবহার করতে হতো, যা অনেকের কাছে বিরক্তিকর মনে হতো। এখন একটিমাত্র কিউআর কোডের মাধ্যমেই যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার অ্যাপ দিয়ে বিল পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে, যা লেনদেন প্রক্রিয়াকে অনেক সহজ ও দ্রুত করে তুলেছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে সামগ্রিকভাবে দেশের ডিজিটাল আর্থিক কাঠামো আরও মজবুত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দৈনিক লেনদেনের অঙ্ক আরও বাড়তে পারে। নগদবিহীন লেনদেনের এই প্রবণতা শুধু আর্থিক খাতেই নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। একই সঙ্গে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এটি নগদ টাকা সংরক্ষণ ও হিসাব রাখার ঝক্কি কমানোর একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে বলেও মত দিচ্ছেন তাঁরা।

