বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর একটি হলো ব্যাংকিং খাত। শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, আবাসন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ—অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি কর্মকাণ্ডই কোনো না কোনোভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুশাসনের ঘাটতি, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম, বেনামি ঋণ, অর্থ পাচার এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে ব্যাংক খাতে যে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে, তার প্রত্যক্ষ প্রভাব এখন পড়ছে তারল্য ব্যবস্থাপনা ও আমানতকারীর আস্থার ওপর।
২০২৫-২৬ সালের বর্তমান বাস্তবতায় ব্যাংক খাতের তারল্য সংকটকে শুধু নগদ অর্থের সাময়িক ঘাটতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম, দুর্বল সম্পদমান, বিপুল খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং সর্বোপরি আমানতকারীর আস্থার টানাপোড়েনের সম্মিলিত ফল। ফলে ব্যাংকে হিসাব খোলার ক্ষেত্রেও গ্রাহকের আচরণ বদলে যাচ্ছে। আগে যেখানে সুদের হার, সেবার মান কিংবা শাখার সংখ্যা ছিল ব্যাংক বাছাইয়ের প্রধান বিবেচনা, এখন সেখানে যুক্ত হয়েছে আরও মৌলিক প্রশ্ন—ব্যাংকটি কতটা নিরাপদ এবং প্রয়োজনের সময় আমানতের অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে কি না।
ব্যাংকিং ব্যবসার ভিত্তি হলো আমানতকারীর আস্থা। একজন গ্রাহক ব্যাংকে অর্থ জমা রাখেন এই প্রত্যাশায় যে তাঁর অর্থ নিরাপদ থাকবে এবং প্রয়োজনের সময় তা ফেরত পাওয়া যাবে। এই অদৃশ্য আস্থার চুক্তিতে ফাটল ধরলেই তার প্রভাব দ্রুত ব্যাংকের নগদ প্রবাহে প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্যাংকে বেনামি ঋণ, বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ পাচারের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দুর্বল কয়েকটি ব্যাংক এবং শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে তারল্যের চাপ বেড়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিশেষ ও জরুরি তারল্য সহায়তা দিতে হয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য রয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সামগ্রিকভাবে বড় অঙ্কের উদ্বৃত্ত বা অলস তারল্য থাকলেও সেই অর্থ সব ব্যাংকে সমানভাবে বণ্টিত নয়। অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ব্যাংকগুলোতে আমানত বাড়ছে, বিপরীতে দুর্বল ব্যাংকগুলো গ্রাহকের অর্থ উত্তোলনের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। অর্থাৎ সমস্যা কেবল অর্থের পরিমাণে নয়; মূল সমস্যা অর্থের অসম বণ্টন ও আস্থার অসম বিন্যাসে।
এই পরিস্থিতি ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ব্যাংকে অতিরিক্ত তারল্য থাকলেই অন্য ব্যাংকের তারল্য সংকট স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূর হয় না। আন্তঃব্যাংক আস্থার ঘাটতি তৈরি হলে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা ব্যাংকও দুর্বল ব্যাংককে অর্থ ধার দিতে অনাগ্রহী হতে পারে। ফলে পুরো ব্যবস্থায় অর্থের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়।
আস্থার এই সংকট এখন গ্রাহকের আচরণেও দৃশ্যমান। সাধারণ আমানতকারী থেকে শুরু করে করপোরেট প্রতিষ্ঠান—সবাই ব্যাংক নির্বাচনের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক। যত্রতত্র নতুন হিসাব খোলার পরিবর্তে গ্রাহকের একটি বড় অংশ অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী রাষ্ট্রায়ত্ত ও শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংককে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
এর ফলে ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও তার গন্তব্য বদলে যাচ্ছে। অর্থাৎ নতুন আমানত আসছে, কিন্তু সব ব্যাংক সমানভাবে সেই আমানত পাচ্ছে না। শক্তিশালী ব্যাংকগুলো আমানত আকর্ষণ করছে, আর দুর্বল ব্যাংকগুলো নতুন গ্রাহক ধরে রাখতে ও নতুন হিসাব খুলতে বাড়তি চাপের মুখে পড়ছে।
ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এনবিএফআই খাতের ক্ষেত্রেও অনাস্থার প্রভাব রয়েছে। যেসব গ্রাহক অতীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অর্থ আটকে যাওয়ার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন, তাঁদের একটি অংশ এখন তুলনামূলক নিরাপদ ও বেশি নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে আর্থিক খাতে আস্থার বিষয়টি এখন শুধু ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সামগ্রিক আর্থিক মধ্যস্থতা ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলছে।
ব্যাংক খাতের বর্তমান বাস্তবতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তারল্য থাকা সত্ত্বেও ঋণপ্রবাহ প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না। ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ করলেও বেসরকারি খাতে নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিতে চাইছে না। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগ পরিবেশের দুর্বলতার কারণে ব্যাংকগুলো অপেক্ষাকৃত নিরাপদ সম্পদে অর্থ রাখাকে বেশি পছন্দ করছে।
ফলে আমানতের একটি অংশ উৎপাদনশীল বিনিয়োগে না গিয়ে সরকারি সিকিউরিটিজ ও ট্রেজারি বিলে চলে যাচ্ছে। এতে ব্যাংকের অর্থ তুলনামূলক নিরাপদ জায়গায় থাকলেও অর্থনীতির বাস্তব খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগে।
এই পরিস্থিতির একটি প্রতিফলন দেখা গেছে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহারে, যা ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো ঝুঁকিপূর্ণ বেসরকারি খাতে অর্থায়নের পরিবর্তে তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ বিনিয়োগ করছে। এটি একদিকে ব্যাংকের ঝুঁকি কমালেও অন্যদিকে অর্থনীতির উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে অর্থের প্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে।
তারল্য সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটকগুলোর একটি হলো রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ। সরকারি ও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশেরও বেশি।
এত বিপুল পরিমাণ অর্থ অনাদায়ী অবস্থায় আটকে থাকায় ব্যাংকের সম্পদের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হিসাবের খাতায় ঋণ সম্পদ হিসেবে থাকলেও তা সময়মতো নগদে রূপান্তরিত না হওয়ায় ব্যাংকের প্রকৃত তারল্য সক্ষমতা কমে যায়। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সংস্থান করতে গিয়ে ব্যাংকের মূলধনও ক্ষয় হয়।
ফলে কিছু ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা বা ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়েছে। এর পরিণতিতে দৈনন্দিন লেনদেন পরিচালনা এবং আমানতকারীর অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখতে অনেক ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেপো ও বিশেষ তারল্য সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এখানে সমস্যাটি দ্বিমুখী। খেলাপি ঋণ ব্যাংকের তারল্য কমায়, আবার তারল্য সংকট ব্যাংকের নতুন ঋণ বিতরণ ও আয় করার সক্ষমতাও কমিয়ে দেয়। ফলে দুর্বলতা এক ধরনের চক্র তৈরি করে, যা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হতে পারে।
ব্যাংক খাতকে দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সংকট থেকে বের করে আনতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ও পরবর্তী সরকারের ধারাবাহিকতায় পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কৌশলগত সংস্কার পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। এর লক্ষ্য শুধু সংকটে থাকা ব্যাংককে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ দেওয়া নয়; বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা।
পরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের আর্থিক অবস্থা, তারল্য ও সম্পদমানের ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন করে খারাপ ঋণ সৃষ্টির পথ বন্ধ এবং বিদ্যমান খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে ব্যাংকের সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি বা Risk-based Supervision, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালীকরণ এবং ঋণ আদায়ের ওপর নিবিড় নজরদারি বাড়াতে হবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কোনো সংস্কারই স্থায়ী ফল দেবে না।
যেসব ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত দুর্বলতায় ভুগছে, তাদের ক্ষেত্রে শুধু তারল্য সহায়তা দিয়ে টিকিয়ে রাখা কতটা যুক্তিসঙ্গত—সেই প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে। বিশেষ করে দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোকে একীভূতকরণের মতো কাঠামোগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তবে একীভূতকরণ যেন শুধু সমস্যাকে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যালান্সশিট থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানের ব্যালান্সশিটে স্থানান্তর না করে, সে জন্য আগে প্রকৃত আর্থিক ক্ষতি ও সম্পদের মান নির্ধারণ জরুরি।
এ ক্ষেত্রে স্বাধীন অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকের ঋণ, জামানত, বিনিয়োগ ও অন্যান্য সম্পদের প্রকৃত মূল্য স্বাধীনভাবে যাচাই না করে কোনো ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্য বোঝা সম্ভব নয়।
পাশাপাশি ব্যাংক রেজুলেশন আইন এবং অর্থঋণ আদালতের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। বছরের পর বছর আইনি জটিলতায় আটকে থাকা ঋণ ও সম্পদ দ্রুত পুনরুদ্ধার করা না গেলে খেলাপি ঋণের পাহাড় কমবে না। তাই ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দ্রুত আইনি ব্যবস্থা এবং একই সঙ্গে প্রকৃত ব্যবসায়িকভাবে সমস্যাগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের জন্য বাস্তবসম্মত পুনর্গঠনের সুযোগ—দুই ব্যবস্থাই প্রয়োজন।
ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা অবশ্যই প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এটি স্থায়ী সমাধান নয়। কোনো ব্যাংকের সমস্যা যদি সাময়িক নগদ সংকট হয়, তাহলে তারল্য সহায়তা কার্যকর। কিন্তু সমস্যা যদি মূলধন ঘাটতি, বিপুল খেলাপি ঋণ, দুর্বল সম্পদমান ও সুশাসনের অভাব হয়, তাহলে শুধু অর্থ সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখা ভবিষ্যতের সংকট আরও বড় করতে পারে।
তাই জরুরি তারল্য সহায়তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের জন্য সুস্পষ্ট সংস্কার পরিকল্পনা, সময়সীমা ও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোকে দুর্বল ব্যাংকের সমস্যার বোঝা বহনের ক্ষেত্রে কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হবে, সেটিও স্পষ্ট করতে হবে।
ব্যাংক খাতকে সুস্থ করতে শুধু ব্যাংকের ভেতরের সংস্কার যথেষ্ট নয়। গ্যাস, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো ও ব্যবসায়িক পরিবেশের সমস্যাগুলো সমাধান না হলে নতুন বিনিয়োগের চাহিদা বাড়বে না। বিনিয়োগ না বাড়লে ব্যাংকের হাতে থাকা অর্থ উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হওয়ার সুযোগও সীমিত থাকবে।
অতএব, ব্যাংক সংস্কারের সঙ্গে বাস্তব অর্থনীতির সংস্কারকে একই ধারায় এগিয়ে নিতে হবে। শিল্প ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নির্ভরযোগ্য করা, অবকাঠামোগত বাধা কমানো এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়বে। তখন ব্যাংকের অতিরিক্ত তারল্যও অর্থনীতির উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
আস্থা পুনর্গঠনের জন্য কয়েকটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার ব্যাংক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্বাধীন ও নিয়মিত AQR-এর মাধ্যমে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্য প্রকাশ করতে হবে। তৃতীয়ত, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং ঋণ বিতরণে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। চতুর্থত, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, আমানতকারীর অর্থ সুরক্ষা ও ব্যাংকিং গোপনীয়তার বিষয়ে দৃশ্যমান নিশ্চয়তা দিতে হবে।
একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থা আরও ঝুঁকিভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও আগাম সতর্কতামূলক হতে হবে। কোনো ব্যাংক সংকটে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সংকটের লক্ষণ আগেই শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই হবে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের পরিচয়।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান তারল্য সংকট আসলে বহু বছরের সুশাসনহীনতা, ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, আর্থিক অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, মূলধন ক্ষয় এবং আস্থার সংকটের সম্মিলিত প্রতিফলন। তাই এর সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। শুধু নীতি সুদহার পরিবর্তন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা কিংবা দুর্বল ব্যাংককে সাময়িকভাবে অর্থ জোগান দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
গ্রাহকের নতুন হিসাব খোলার প্রবণতাও এখন ব্যাংকের প্রতি আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। মানুষ যেখানে নিরাপদ মনে করছে, অর্থ সেখানেই সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে ব্যাংকের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা শুধু সুদের হার বা প্রযুক্তিগত সেবার ওপর নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে আর্থিক সক্ষমতা, স্বচ্ছতা, সুশাসন ও আমানতকারীর অর্থ ফেরত দেওয়ার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।
ব্যাংকিং খাতকে টেকসই পথে ফেরাতে হলে এখন প্রয়োজন ‘তারল্য ব্যবস্থাপনা’ থেকে ‘আস্থা ব্যবস্থাপনা’য় নীতিগত গুরুত্ব স্থানান্তর করা। ব্যাংকের ব্যালান্সশিট পরিষ্কার করা, খেলাপি ঋণ উদ্ধার, দুর্বল ব্যাংকের কাঠামোগত পুনর্গঠন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা, শক্তিশালী তদারকি এবং বিনিয়োগবান্ধব অর্থনৈতিক পরিবেশ—এই সবকিছুর সমন্বিত বাস্তবায়নই পারে আস্থার সংকট কাটাতে।
কারণ শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের সবচেয়ে বড় মূলধন টাকা নয়—আস্থা। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনা গেলে নতুন হিসাব শুধু বাড়বেই না, সেই আমানতও আবার উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শক্তিতে রূপান্তরিত হবে।

