বাংলাদেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকগুলো ২০২৫ সালে ঋণ বিতরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ঝুঁকি বিবেচনায় ব্যাংকগুলো তুলনামূলক সতর্ক ব্যবসায়িক কৌশল গ্রহণ করায় এই প্রবণতা দেখা গেছে। তবে ঋণ বিতরণ কমলেও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে তাদের সক্রিয় ভূমিকা, শক্তিশালী তারল্য এবং মুনাফা বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকের কার্যক্রম: প্রবণতা ও পরিচালনাগত বিশ্লেষণ (জুলাই-ডিসেম্বর, ২০২৫)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে পরিচালিত নয়টি বিদেশি ব্যাংকের মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ২০২৫ সালের শেষে দাঁড়ায় ৪৬ হাজার ১২২ কোটি টাকা। আগের বছর এই পরিমাণ ছিল ৫১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে বাণিজ্য ও ব্যবসা খাতে। ২০২৪ সালের ১৫ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা থেকে এই খাতে ঋণ কমে ৯ হাজার ১১০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, যা প্রায় ৪২ শতাংশ হ্রাস। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে অর্থায়নের গতি কমে যাওয়া এবং পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ পুনর্বিন্যাসের কারণেই এই পতন ঘটেছে। একই সময়ে নির্মাণ খাতেও ঋণ বিতরণ কমেছে।
অন্যদিকে শিল্প খাতে বিদেশি ব্যাংকের আস্থা এখনো শক্তিশালী রয়েছে। রপ্তানিমুখী শিল্প এবং বৈশ্বিক উৎপাদন শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্থায়ন অব্যাহত থাকায় শিল্প খাতে ঋণ ৬ শতাংশ বেড়ে ২৪ হাজার ২৬৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি ব্যাংকগুলো সাধারণত কম ঝুঁকিপূর্ণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যনির্ভর শিল্পে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হওয়ায় এই খাতে প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে।
কৃষি, মৎস্য ও বনজ খাতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। এসব খাতে ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। যদিও মোট ঋণ বিতরণে এই খাতগুলোর অংশ এখনো তুলনামূলক ছোট, তবুও প্রবৃদ্ধির হার ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ায় দেশের মোট ব্যাংকিং ঋণে বিদেশি ব্যাংকের অংশও হ্রাস পেয়েছে। ২০২৪ সালের শেষে যেখানে এই অংশ ছিল ৩ শতাংশ, ২০২৫ সালের শেষে তা নেমে এসেছে ২ দশমিক ৬ শতাংশে। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ ঋণ বাজারে বিদেশি ব্যাংকের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় আরও সীমিত হয়েছে।
তবে ঋণ কমলেও দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বিদেশি ব্যাংকের গুরুত্ব অপরিবর্তিত রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৯ শতাংশ বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে। একই সময়ে আমদানির প্রায় ১৩ শতাংশ লেনদেনও এসব ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প, কাঁচামাল, মূলধনী যন্ত্রপাতি এবং শিল্প উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিতে বিদেশি ব্যাংকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, রপ্তানিতে তাদের অংশ আমদানির তুলনায় বেশি হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অবদান ইতিবাচক। এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহকে সহায়তা করছে এবং অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানতভিত্তি স্থিতিশীল রয়েছে। মোট ব্যাংকিং খাতের ৪ দশমিক ২ থেকে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ আমানত তাদের হাতে রয়েছে, যা তাদের ঋণ বিতরণের অংশের চেয়ে বেশি। এর ফলে এসব ব্যাংকের হাতে উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে এবং তারা তুলনামূলক রক্ষণশীল ঋণনীতি অনুসরণ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, অস্থির অর্থনৈতিক সময়ে এই ধরনের অবস্থান সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক।
মুনাফার ক্ষেত্রেও বিদেশি ব্যাংকগুলো ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে তাদের নিট মুনাফা বেড়ে ৩ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। কর ব্যয় কমে যাওয়াকে এই প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
একই সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা মুনাফা নিজ নিজ দেশে পাঠিয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের ৫৭৭ কোটি টাকার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। বিপরীতে দেশে পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফার পরিমাণ ৪ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা থেকে কমে ২ হাজার ৯৬ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ মুনাফা অর্জন বাড়লেও সেই অর্থের একটি বড় অংশ নতুন বিনিয়োগে ব্যবহারের পরিবর্তে বিদেশে পাঠানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি ব্যাংকগুলোর এই কৌশল বর্তমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রতিফলন। তারা ঝুঁকিপূর্ণ খাতে ঋণ কমিয়ে তারল্য সংরক্ষণ এবং উচ্চমানের গ্রাহকদের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্য ও রপ্তানিমুখী শিল্পে তাদের সক্রিয় উপস্থিতি বজায় থাকায় দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকও মনে করছে, শক্তিশালী মূলধন, পর্যাপ্ত তারল্য, সন্তোষজনক মুনাফা এবং তুলনামূলক কম খেলাপি ঋণের কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলো এখনো আর্থিকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। তবে ঋণ প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং ঝুঁকি মোকাবিলায় সংরক্ষিত তহবিলের পরিবর্তনের বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কারণ দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই হবে বিদেশি ব্যাংকগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

