একসময় দেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতে মুনাফা ও আস্থার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ছিল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। বছরের পর বছর ধারাবাহিক মুনাফা করে আসা এই ব্যাংক এখন এমন এক আর্থিক সংকটের মুখোমুখি, যা প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে নজিরবিহীন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ব্যাংকটির সমন্বিত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
অথচ মাত্র এক বছর আগে একই সময়ে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ৬৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকার এই নাটকীয় পরিবর্তন কেবল একটি ব্যাংকের সংকট নয়, বরং দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের গভীর দুর্বলতারই একটি স্পষ্ট প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিশ্লেষকদের ভাষ্যে, ইসলামী ব্যাংকের এই লোকসান হঠাৎ করে তৈরি হওয়া কোনো সমস্যা নয়। বরং গত কয়েক বছর ধরে চলে আসা বিতর্কিত ঋণ বিতরণ, খেলাপি বিনিয়োগের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, আয় কমে যাওয়া এবং আমানতের বিপরীতে মুনাফা পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ—এসব মিলিয়েই পরিস্থিতি আজকের এই জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে ব্যাংকের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বিশাল ফারাক তৈরি হয়ে গেছে।
ব্যাংকিং ব্যবসার মূল কাঠামো হলো, আমানতকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে সেই অর্থ ঋণ বা বিনিয়োগ হিসেবে বিতরণ করা এবং সেখান থেকে আয় করা। সেই আয় থেকেই আমানতকারীদের মুনাফা দেওয়া হয় এবং পরিচালন ব্যয় মিটিয়ে ব্যাংক তার নিজস্ব লাভ করে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটিই ভেঙে পড়েছে। ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, বর্তমানে ব্যাংকটির মোট আমানত প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এই বিশাল অঙ্কের মধ্যে মাত্র প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ থেকেই প্রকৃত আয় আসছে। বাকি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বড় অংশই এমন সব ঋণ বা বিনিয়োগে আটকে রয়েছে, যেখান থেকে কোনো অর্থ ফেরত আসছে না। ফলে একদিকে ব্যাংকের হাতে নগদ আয় কমছে, অন্যদিকে আমানতকারীদের নিয়মিত মুনাফা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা অপরিবর্তিত থেকে যাচ্ছে। আয় না থাকলেও ব্যয় থেমে নেই—এই বৈপরীত্যই লোকসানের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
ব্যাংকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সরাসরি স্বীকার করেছেন, সংকটের প্রধান কারণ একটি নির্দিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীকে দেওয়া বিপুল অঙ্কের ঋণ। তাঁদের ভাষ্যমতে, নিয়ম-বহির্ভূতভাবে প্রদান করা এসব ঋণের বড় অংশ এখন কার্যত অকেজো হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব ঋণ থেকে কোনো কিস্তি বা মুনাফা আদায় করা যাচ্ছে না, ফলে যে সম্পদ থেকে ব্যাংকের নিয়মিত আয় আসার কথা ছিল, সেটিই এখন অলস ও অনুৎপাদনশীল সম্পদে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের সম্পদের বড় অংশ যদি এভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে, তাহলে সেই ব্যাংকের পক্ষে মুনাফা ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়—ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংকটির লোকসান ছিল ২৮৮ কোটি টাকা। কিন্তু এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত মাত্র তিন মাসেই সেই লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৮ কোটি ২৬ লাখ টাকায়। অর্থাৎ মোট লোকসানের প্রায় ৭৮ শতাংশই তৈরি হয়েছে বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে, যা স্পষ্ট করে দেয় যে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার অবনতি কতটা দ্রুতগতিতে ঘটছে।
অথচ কিছুদিন আগেও ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দুই হাজার তেইশ সালে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ৬৩৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, দুই হাজার চব্বিশ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১০৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকায়, আর দুই হাজার পঁচিশ সালে মুনাফা ছিল ১৩৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এর আগের কয়েক বছরও ব্যাংকটি ধারাবাহিকভাবে লাভজনক অবস্থানে ছিল। এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতা ভেঙে চলতি বছরে রেকর্ড লোকসানে পড়াটা তাই ব্যাংক খাতের জন্য একটি বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ব্যাংকটি নিজেই জানিয়েছে, খেলাপি বিনিয়োগ ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ার কারণে তাদের সামগ্রিক বিনিয়োগ আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। অন্যান্য ব্যাংকে রাখা অর্থের বিপরীতেও আগের তুলনায় কম আয় হয়েছে। অথচ আমানত ধরে রাখতে তুলনামূলক বেশি হারে মুনাফা দিতে হচ্ছে। আয়ের তুলনায় ব্যয় দ্রুতগতিতে বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের গভীরতা আরও বেড়েছে।
এ বিষয়ে ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক সংবাদমাধ্যমকে জানান, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হওয়ায় তাদের পক্ষে আদায় না হওয়া অর্থকে হিসাবের খাতায় আয় হিসেবে দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের অর্থ আলাদা একটি হিসাবে জমা রাখা হয়, যার ফলে কাগজে-কলমে ব্যাংকের প্রকৃত আয় আরও কম দেখায়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে আটকে থাকা এসব অর্থ আদায় করা সম্ভব হলে ব্যাংকের মুনাফাও দ্রুত ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে।
সংকট থেকে বের হওয়ার উপায় নিয়েও কথা বলেছেন ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগে গঠিত হতে যাওয়া একটি বিশেষায়িত সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান কার্যকর হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। এই প্রতিষ্ঠান সমস্যাগ্রস্ত ঋণগুলো কিনে নিলে ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি বিশেষ নীতিগত ছাড় দিয়ে এসব মন্দ ঋণ আলাদাভাবে ব্যবস্থাপনার সুযোগ দেয়, তাহলেও ব্যাংকটি কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইতিমধ্যে নতুন করে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার আমানত এসেছে, এবং নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনসহ সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে করপোরেট গ্রাহকদের আস্থা আরও বাড়বে বলে তারা প্রত্যাশা করছেন।
শুধু এই একটি ব্যাংকই নয়, একই সময়ে আরেকটি বেসরকারি ব্যাংকও ১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকার বেশি লোকসানের কথা জানিয়েছে, যাদের নিট সম্পদমূল্যও ঋণাত্মক অবস্থানে চলে গেছে। বড় দুটি ব্যাংকের এই ফলাফল স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে, দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন, বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং সম্পদের মানের ক্রমাগত অবনতি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের জন্যই একটি বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন মূলধন জোগান দিয়ে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। এর জন্য প্রয়োজন বিতর্কিত ঋণের দ্রুত ও স্বচ্ছ নিষ্পত্তি, খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন নিশ্চিত করা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর তদারকি। এসব পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতির টেকসই উন্নতি প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এই আর্থিক প্রতিবেদন কেবল একটি ব্যাংকের লোকসানের হিসাব নয়—এটি দেশের ব্যাংকিং খাতের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাস্তব ও গভীর সংকটের স্পষ্ট বার্তা। যখন আয়ের প্রধান উৎসগুলো বন্ধ হয়ে যায়, অথচ আমানতকারীদের প্রতি দায় অপরিবর্তিত থাকে, তখন হাজার কোটি টাকার লোকসান কেবলই সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়—এই ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি যেন তারই সবচেয়ে বড় বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

