দেশকে নগদ টাকার ওপর নির্ভরশীলতা থেকে ধীরে ধীরে ডিজিটাল লেনদেনের দিকে নিয়ে যেতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গত ১ জুলাই থেকে সব ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান এবং পেমেন্ট সেবাদাতাদের জন্য বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই নতুন ব্যবস্থা প্রত্যাশিত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে না। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো প্রতিটি লেনদেনে ব্যবসায়ীদের গুনতে হওয়া বাধ্যতামূলক ফি।
বর্তমানে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সর্বনিম্ন ১ শতাংশ ফি নেওয়া হয়, যার মধ্যে মূল্য সংযোজন করও অন্তর্ভুক্ত। আগে এই ফি-এর কোনো সর্বনিম্ন সীমা ছিল না, তবে সর্বোচ্চ হার ছিল ১.১৫ শতাংশ। নতুন নিয়মে ন্যূনতম ফি নির্ধারণ করায় অনেক ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী এই ব্যবস্থায় আগ্রহ হারাচ্ছেন।
খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, অনেক ব্যবসায়ী এই অতিরিক্ত খরচ পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ করে শেষ পর্যন্ত ক্রেতার কাছ থেকেই আদায় করছেন। আবার যারা দাম বাড়াচ্ছেন না, তারা প্রতিটি লেনদেনে সর্বোচ্চ ১.১৫ শতাংশ পর্যন্ত আয় হারাচ্ছেন। ফলে নগদ লেনদেনের তুলনায় বাংলা কিউআর ব্যবহার তাদের কাছে কম লাভজনক হয়ে উঠছে।
ব্যাংকারদের মতে, শুধু লেনদেন ফি নয়, আরও কয়েকটি কারণও বাংলা কিউআরের বিস্তারকে ধীর করে দিচ্ছে। ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতা, স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়া, দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ, তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং সাধারণ মানুষের ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
সিটি ব্যাংকের ডিজিটাল ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান সৈয়দ ইব্রাহিম সাজিদ মনে করেন, সাধারণ মানুষকে নগদবিহীন লেনদেনের সুবিধা সম্পর্কে আরও সচেতন করতে হবে। একই সঙ্গে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত ফি চাপিয়ে না দিয়ে প্রণোদনার মাধ্যমে এই ব্যবস্থায় যুক্ত করতে হবে। তাঁর মতে, শুরুতে প্রতিবেশী দেশ ভারতও কিউআরভিত্তিক লেনদেন জনপ্রিয় করতে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়েছিল। বাংলাদেশেও একই ধরনের পদক্ষেপ নিলে বাংলা কিউআরের ব্যবহার দ্রুত বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলা কিউআর কার্যক্রম-সংক্রান্ত কমিটির সদস্য এবং একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মো. মাহিউল ইসলাম জানিয়েছেন, বাংলা কিউআর বিস্তার সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর আশা, আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাবে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক লেনদেন ফি বা মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিও পুনর্বিবেচনা করছে। কীভাবে এই খরচ আরও যৌক্তিক করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যবসায়ীদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হয়েছে। সে কারণেই একটি নির্দিষ্ট ফি রাখা হয়েছে। তবে লেনদেনের পরিমাণ বাড়লে এই ফি কমিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।
তিনি জানান, আগে কিছু প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র বাজার দখলের উদ্দেশ্যে বিনা মূল্যে এই সেবা দিচ্ছিল, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ছিল না। তাই একটি সর্বনিম্ন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে বাজারে প্রতিযোগিতা থাকলেও সেবাটি স্থিতিশীলভাবে পরিচালিত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ বাংলা কিউআর লেনদেন হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১৮ লাখ ৫০ হাজার ব্যবসায়ী এই ব্যবস্থার আওতায় এসেছেন, যার প্রায় অর্ধেকই শহরাঞ্চলে।
মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় বাংলা কিউআর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে বিকাশ, যার আওতায় রয়েছে প্রায় ৫ লাখ ব্যবসায়ী। ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে পূবালী ব্যাংক, যার প্রায় ২ লাখ ব্যবসায়ী বাংলা কিউআর ব্যবহার করছেন। এছাড়া ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ব্র্যাক ব্যাংক, ডিজি পে, সেবা ফিনটেক এবং নগদও তাদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করছে।
গত বছর ‘নগদবিহীন বাংলাদেশ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে স্থানীয় সরকার বিভাগ সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাকে খুচরা ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর ব্যবহারের নির্দেশ দেয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকও সব ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান এবং পেমেন্ট সেবাদাতাদের নিজস্ব কিউআর কোডের পরিবর্তে ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে বাংলা কিউআর চালুর নির্দেশনা দেয়।
এখন ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান এবং পেমেন্ট সেবাদাতাদের মধ্যে পূর্ণ সমন্বয় চালু হওয়ায় একজন গ্রাহক যেকোনো অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যেকোনো বাংলা কিউআর স্ক্যান করে তাৎক্ষণিকভাবে মূল্য পরিশোধ করতে পারছেন এবং ব্যবসায়ীও সঙ্গে সঙ্গে অর্থ গ্রহণ করছেন।
বাংলা কিউআরের ব্যবহার আরও বাড়াতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ১০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই তহবিল থেকে ছোট ব্যবসায়ীদের লেনদেন ফি ভর্তুকি দেওয়া হবে। তবে কারা এই সুবিধা পাবেন এবং কীভাবে ভর্তুকি কার্যকর হবে, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শিগগিরই বিস্তারিত নীতিমালা প্রকাশ করবে।

