বীমা খাতে তথ্য গোপন ও কারচুপি রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। সম্প্রতি কুমিল্লার বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে (বার্ড) ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত দুই দিনব্যাপী কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন জানিয়েছেন, অনেক বীমা কোম্পানি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সঠিক তথ্য না দিয়ে গোপন ‘ডাবল সার্ভার’ ব্যবহার করছে। তিনি বীমা কোম্পানিগুলোকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যে সব গোপন বা অতিরিক্ত সার্ভার বন্ধ করে তথ্য একীভূত করতে হবে। এই সময়সীমার মধ্যে নির্দেশনা না মানলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বীমা কোম্পানিগুলো যখন একাধিক বা গোপন সার্ভার ব্যবহার করে, তখন তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে কোম্পানির প্রকৃত ব্যবসা, প্রিমিয়াম আয় ও আর্থিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ চিত্র দিতে পারে না। আইডিআরএ চেয়ারম্যানের ভাষায়, “লাইফ ও নন-লাইফ দুই খাতের কোম্পানিগুলোর দেওয়া আর্থিক প্রতিবেদন বাস্তব চিত্রের সঙ্গে সব সময় মেলে না”। এর ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যকরভাবে বীমা কোম্পানিগুলোর ওপর নজরদারি করতে পারে না; শুধু তাই নয়, ২০২৬ সালে বসে ২০২৫ সালের অডিট প্রতিবেদন পাওয়া গেলেও তা দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি তদারকি করা কঠিন। আর যদি সেই তথ্যই সঠিক না হয়, তাহলে দেড় বছর আগের তথ্য দেখে বর্তমান ঝুঁকি শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, গ্যারেজে, বিছানার নিচে বা দেশের যেকোনো জায়গায় সার্ভার লুকিয়ে রাখলেও প্রযুক্তিগত নিরীক্ষার মাধ্যমে তা শনাক্ত করা হবে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) ও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে আইডিআরএ বীমা খাতে তথ্যের স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে চায়।
ডিসেম্বরেই আসছে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি
তথ্য নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে আইডিআরএ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বীমা খাতে পূর্ণাঙ্গ ‘ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি’ (রিস্ক-বেজড সুপারভিশন) ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে। এ ব্যবস্থায় কোন কোম্পানিতে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, কোথায় তথ্যের ঘাটতি রয়েছে এবং কী ধরনের তথ্য দেওয়া হচ্ছে তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। আইডিআরএ চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, এই ব্যবস্থা চালু হলে আইডিআরএ একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পরিণত হবে।
পাশাপাশি, আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে পুরো বীমা খাতের জন্য ‘ইউনিক পলিসি আইডি’ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই ব্যবস্থা চালু হলে পলিসি ট্র্যাকিং সহজ হবে, প্রিমিয়াম প্রবাহ মনিটরিং করা যাবে এবং জালিয়াতি রোধ করা সম্ভব হবে। নন-লাইফ বীমা খাতের জন্য কভার নোটের ডিজিটাল ভেরিফিকেশন ব্যবস্থাও চালু করা হচ্ছে, যাতে ব্যাংকগুলো এলসি খোলার আগে আইডিআরএ সিস্টেমের মাধ্যমে কভার নোট যাচাই করতে পারে।
আইডিআরএ একা এই সংস্কার করতে পারবে না, এটি বুঝেই সংস্থাটি বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও বিএসইসি-এর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করছে। আইডিআরএ চেয়ারম্যান ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করেছেন এবং সমর্থনের আশ্বাস পেয়েছেন। তিনি এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করতে চান, এবং বিএসইসির সঙ্গে যৌথ বিশেষ নিরীক্ষায় কাজ চলছে। লক্ষ্য হলো, তথ্য আদান-প্রদানকে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, যাতে চেয়ারম্যান বা কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও সহযোগিতা অব্যাহত থাকে।
তথ্য কারচুপি রোধের পাশাপাশি বীমা খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা বকেয়া দাবি পরিশোধ ও মোকাবিলা করছে আইডিআরএ। আইডিআরএ চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, সংকটে থাকা সাত থেকে আটটি বীমা কোম্পানির জমি, ট্রেজারি বন্ড ও ফিক্সড ডিপোজিট নগদায়ন করে আলাদা ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকেই ‘আগে আবেদন, আগে পরিশোধ’ (ফার্স্ট-ইন, ফার্স্ট-আউট) নীতির ভিত্তিতে গ্রাহকদের পাওনা ফেরত দেওয়া শুরু হবে। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, কোম্পানিটির প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বকেয়া দাবি রয়েছে। সম্পদ বিক্রি ও বন্ড নগদায়নের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে কয়েকশ কোটি টাকা সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।
তবে স্বস্তির খবরের পাশাপাশি একটি বাস্তবতাও তুলে ধরেছেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান। ব্যালেন্স শিটে সম্পদ থাকলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নগদ অর্থে রূপান্তরযোগ্য নয়। জমির মতো সম্পদের মূল্যায়ন, মালিকানা যাচাই ও বিক্রি প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ, এবং বিক্রয়মূল্য বইয়ের মূল্য থেকে ভিন্ন হতে পারে। তাই বীমাগ্রাহকদের জন্য প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো, তদন্তের মাধ্যমে কতটুকু অর্থ উদ্ধার সম্ভব হয় এবং সেই অর্থ প্রকৃত দাবিদারদের কাছে পৌঁছায় কিনা।
শিল্পের প্রতিক্রিয়া
বীমা খাতের সংস্কার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন শিল্পের অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিরাও। ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী সৈয়দ শেহাব উল্লাহ আল-মানজুর বলেছেন, সংস্কারের দিকটি সঠিক, তবে বাস্তবায়নের জন্য স্পষ্ট নির্দেশিকা, অগ্রাধিকারভিত্তিক সময়সীমা ও উপযুক্ত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো প্রয়োজন। অন্যদিকে, সিনিয়র বীমা শিল্প বিশেষজ্ঞ এস এম জিয়াউল হক মনে করছেন, শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই হবে না; নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য যাচাইয়ের কার্যকর প্রক্রিয়া থাকতে হবে।
বীমা খাতের এই সংস্কার উদ্যোগ সময়ের দাবি। ডাবল সার্ভার বন্ধ, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি চালু, ইউনিক পলিসি আইডি এবং বকেয়া দাবি পরিশোধ এই চারটি উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বীমা খাতে স্বচ্ছতা বাড়বে, এবং সাধারণ বীমাগ্রাহকদের আস্থা ফিরবে। তবে এই সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোরতা, শিল্পের সহযোগিতা এবং তথ্য যাচাইয়ের কার্যকর প্রক্রিয়ার ওপর।

