২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মার্কিন বিদেশি সহায়তা স্থগিতের ঘোষণা দেন। তার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন খাতে। ইউএসএআইডির অর্থায়নে চলা ৫৯টি প্রকল্পের মধ্যে ৫৫টি বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ হারায় প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন সহায়তা। হাজার হাজার উন্নয়নকর্মী চাকরি হারান। অ্যাবট গ্লোবালের কর্মী আমিনুল ইসলাম সোহান সেদিনের কথা এখনও মনে করেন। ‘যেদিন ইউএসএআইডির ঘোষণাটা আসে, ওইদিন আমাদের একটা ওয়ার্কশপ ছিল। ওয়ার্কশপে যাওয়ার পথেই বাইকে থাকা অবস্থাতেই মিটিংয়ে অ্যাটেন্ড করি। আমাদের হেড অফিস ইউএস থেকে তখন সব স্টাফদের জানানো হয় যে, ইউএসএআইডি তাদের ফান্ডগুলো অ্যাসেসমেন্টের আওতায় নেবে, কোনটা রাখবে, কোনটা রাখবে না’।
কিন্তু অদ্ভুত এক বাস্তবতা হলো, ইউএসএইডের সহায়তা কমলেও বাংলাদেশে এনজিওগুলোর বিদেশি অনুদান কিন্তু বেড়েছে। এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে এনজিও খাতে বিদেশি অনুদান ছিল ৬৯৮৬ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯২২০ কোটি টাকায়। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (জুন পর্যন্ত) তা পৌঁছেছে ১০ হাজার ১৪২ কোটি টাকায়। ডলারে যা প্রায় ৮৩৮.২৫ মিলিয়ন ডলার, সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অথচ চাকরি হারানো উন্নয়নকর্মীদের প্লাটফর্ম অ্যাসোসিয়েশন অব আনএমপ্লয়েড ডেভেলপমেন্ট প্রফেশনালসের (এইউডিপি) দাবি, এখনও ৩০ হাজারের বেশি মানুষ বেকার রয়েছেন।
অনুদান বাড়ছে, কিন্তু কর্মসংস্থান ফিরছে না; এই অসংগতির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ আছে।
আইএনজিও ফোরাম বাংলাদেশের আহ্বায়ক ও ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান বলেছেন, ‘যাদের চাকরি গেছে, তারা একটা সময়ে অনেক ভালো চাকরি করতেন এবং যারা মাঠ পর্যায়েও কাজ করতেন, তারা আর দশটা এনজিওর চাইতে অনেক ভালো বেতন পেতেন। তাদেরকে অ্যাকোমডেট করাও বস্তুতপক্ষে খুব ডিফিকাল্ট। ইউএসএআইডির ফান্ডিং, এনভায়রনমেন্ট, সবই খুব উচ্চমানের। আন্তর্জাতিক বা জাতীয় এনজিওরা আসলে কম্প্যাটিবল হয় না’। অর্থাৎ, ইউএসএইডের প্রকল্পে যারা কাজ করতেন, তারা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বেতন পেতেন। নতুন যে অনুদান আসছে, সেগুলোতে সেই বেতন দিতে রাজি নয় অনেক প্রতিষ্ঠান।
অনুদানের পরিমাণ বেড়েছে, কিন্তু প্রকল্পের সংখ্যা কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে অনুমোদিত প্রকল্প ছিল ২০০৭টি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৬৫৪টিতে। অর্থাৎ, কয়েকটি বড় প্রকল্পে অনেক টাকা এলেও মোট প্রকল্পের সংখ্যা কমেছে। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগও কমেছে।
উপকূলীয় এনজিও কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী বলেছেন, ‘ফান্ডিং বাড়ার একটা বড় কারণ রোহিঙ্গা রেসপন্স। কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ কিন্তু লাভবান হচ্ছে না। যেমন কুমিল্লা-ফেনীর বন্যায় আমরা পয়সা খুব একটা পাইনি, কারণ সব টাকা চলে যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের ওখানে’। অনুদান বাড়লেও তা মূলত রোহিঙ্গা শিবিরকেন্দ্রিক প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে, যা স্থানীয় উন্নয়নকর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে না।
বড় এনজিওগুলোর পাশাপাশি ছোট এনজিওগুলো এখন মধ্যপ্রাচ্যের ফাউন্ডেশন; কাতার ফাউন্ডেশন, ইউএই ফাউন্ডেশন, আল খায়ের ফাউন্ডেশন থেকে অর্থায়ন নিচ্ছে। পাশাপাশি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসন খাতে অর্থায়নের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই নতুন অর্থায়নের ধরণ ও প্রকল্পের ধরন পুরোনো কর্মীদের দক্ষতার সঙ্গে মেলে না। অনেক উন্নয়নকর্মীকে নতুন খাতে মানিয়ে নিতে সময় লাগছে।
রাকিব হোসেন, যিনি ইউএসএইডের ‘ফিড দ্য ফিউচার’ প্রকল্পে ওয়াটার সাপ্লাই ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতেন, প্রায় আড়াই মাস বেকার ছিলেন। মামুন হোসাইন, যিনি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে প্রকল্পে কাজ করতেন, প্রায় এক বছর ধরে বেকার। এইউডিপির আহ্বায়ক জিনাত আরা আফরোজ বলেছেন, ‘যারা একদম লো স্কিলড, আর একদম হাই স্কিলড, এদের অনেকেই চাকরি পাননি। হাই স্কিল্ডের নিয়োগের বাজেটের জন্য সমস্যা, আর লো স্কিলডরা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না’।
ইউএসএইডের প্রকল্পগুলোয় কাজ করার অভিজ্ঞতা যাদের আছে, তারা উচ্চমানের কাজে অভ্যস্ত। নতুন প্রকল্পে সেই মান ও বেতন নেই। ফলে তারা যেমন নিচু মানের চাকরি নিতে চান না, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের বেতন দিতে রাজি নয়। এই ‘মিসম্যাচ’ কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এইউডিপি ইতিমধ্যে সরকারের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে একটি ‘ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেটেড ট্যালেন্ট ডিটেকশন সিস্টেম’ চালুর দাবি জানিয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো সাড়া মেলেনি। এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক মোহাম্মদ জকরিয়া জানিয়েছেন, অনুদান বৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখতে তারা কাজ করছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, ইউএসএইডের প্রকল্প বন্ধের ফলে প্রায় ৫০ হাজার উন্নয়নকর্মী চাকরি হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ৩০ হাজার এখনও কর্মহীন। কর্মহীনতার কারণে বছরে ১৫ কোটি টাকার বেশি আয়কর হারাচ্ছে সরকার।
অনুদানের পরিমাণ বাড়লেও তা কর্মসংস্থানে রূপান্তরিত হচ্ছে না, এটি উন্নয়ন খাতের জন্য একটি বড় অসঙ্গতি। শুধু অর্থায়নের পরিমাণ বাড়ালে হবে না, প্রয়োজন সঠিক খাতে অর্থায়ন এবং দক্ষ কর্মীদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা। অন্যথায়, এই অনুদান প্রবাহ কেবল কিছু বড় প্রতিষ্ঠান ও রোহিঙ্গা প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে, আর হাজার হাজার দক্ষ উন্নয়নকর্মী বেকারই থেকে যাবেন।

