রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে সরকার। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, সরকার এখন থেকে এসব ব্যাংকের এমডি পদে সরাসরি নিয়োগ দেবে না; বরং যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবে। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি নিয়ে চূড়ান্তভাবে নিয়োগ সম্পন্ন করবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গত ২৬ জুলাই নতুন এই নীতিমালা জারি করেছে। ‘রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক পদে মনোনয়ন, নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন নীতিমালা, ২০২৬’ শীর্ষক এ নীতিমালা কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে আগের সব নীতিমালা বাতিল হয়েছে।
নতুন নিয়মটি প্রযোজ্য হবে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ রাষ্ট্রমালিকানাধীন ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে। তবে কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিশেষায়িত ব্যাংক এবং বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের দায়িত্ব আগের মতোই সরকারের কাছেই থাকবে।
অন্যদিকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি, পদায়ন এবং আন্তবদলির দায়িত্বও সরকারের হাতেই থাকবে। তবে এসব ক্ষেত্রে আগের তুলনায় অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং অভিন্ন মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ছিল। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়াকে আরও কাঠামোবদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক করার চেষ্টা করা হয়েছে। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের মাধ্যমে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বাছাই করা হলে ব্যাংক পরিচালনায় পেশাদারিত্ব আরও বাড়বে বলে তারা মনে করছেন।
এ বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানিয়েছেন, বাস্তবে আগেও সরকার সরাসরি নিয়োগ দিত না, বরং মনোনয়নই দিত। তবে আগের নীতিমালায় ‘নিয়োগ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল। নতুন নীতিমালায় সেই ভাষাগত অসঙ্গতি সংশোধন করা হয়েছে। কারণ আইনগতভাবে নিয়োগের চূড়ান্ত ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট পরিচালনা পর্ষদের।
তিনি আরও জানান, আগে এমডি, ডিএমডি ও জিএম—তিন স্তরের কর্মকর্তার পদোন্নতি বা নিয়োগসংক্রান্ত ফাইল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হতো। কিন্তু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করার অংশ হিসেবে এখন ডিএমডি ও জিএমদের ফাইল অর্থমন্ত্রী পর্যায়েই নিষ্পত্তি হবে। কেবল এমডিদের বিষয়ে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
নতুন নীতিমালায় এমডি হওয়ার জন্যও নির্দিষ্ট যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রার্থীকে অবশ্যই স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হতে হবে। অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, অর্থায়ন, ব্যাংকিং, ব্যবস্থাপনা অথবা ব্যবসায় প্রশাসনে উচ্চতর ডিগ্রিধারীরা অগ্রাধিকার পাবেন। শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ গ্রহণযোগ্য হবে না। বয়স হতে হবে কমপক্ষে ৪৫ বছর এবং সর্বোচ্চ ৬৫ বছর। নির্বাচিত প্রার্থীর সঙ্গে তিন বছরের চুক্তি করা হবে।
উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মহাব্যবস্থাপক পদেও পদোন্নতির জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকরির অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত দক্ষতার শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন সন্তোষজনক হতে হবে। দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম, গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গ বা নৈতিক স্খলনের অভিযোগ থাকলে তা পদোন্নতির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি অর্থ পাচার প্রতিরোধ, সন্ত্রাসে অর্থায়নবিরোধী ব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকিং আইন সম্পর্কে জ্ঞানও মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।
পদোন্নতির ক্ষেত্রে এবার ১০০ নম্বরের একটি মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪০ নম্বর রাখা হয়েছে বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনের জন্য। শিক্ষাগত যোগ্যতায় ১৫ নম্বর, চাকরির অভিজ্ঞতায় ১৫ নম্বর, চাকরির রেকর্ডে ১০ নম্বর, পেশাগত ব্যাংকিং পরীক্ষায় ৫ নম্বর এবং সাক্ষাৎকারে ১০ নম্বর বরাদ্দ থাকবে। এর লক্ষ্য হলো মূল্যায়নকে ব্যক্তি-নির্ভর না রেখে নির্ধারিত মানদণ্ডের আওতায় আনা।
নীতিমালায় শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতার ওপর নয়, নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, ব্যবসা সম্প্রসারণে অবদান, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং মুনাফা বৃদ্ধিতে ভূমিকার মতো বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিরীক্ষা, বৈদেশিক বাণিজ্য, ঋণ প্রশাসন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং করপোরেট শাখায় কাজের অভিজ্ঞতাও মূল্যায়নের অংশ হবে।
এছাড়া নীতিমালায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জালিয়াতি, আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ থাকলে তা পদোন্নতির পথে বাধা হতে পারে। তদন্তাধীন গুরুতর অভিযোগ, আদালতে বিচারাধীন গুরুত্বপূর্ণ মামলা কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে ধরা পড়া গুরুতর অনিয়মও মূল্যায়নে নেতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হবে।
পুরো প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করতে এমডিদের মনোনয়ন এবং ডিএমডি ও জিএমদের পদোন্নতির জন্য পৃথক কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এমডি মনোনয়ন কমিটির নেতৃত্ব দেবেন অর্থমন্ত্রী। আর ডিএমডি ও জিএম পদোন্নতি কমিটির প্রধান থাকবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। এসব কমিটি প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই, নথিপত্র পর্যালোচনা, সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং নম্বরের ভিত্তিতে সুপারিশ প্রস্তুত করবে। পরে সেই সুপারিশ সংশ্লিষ্ট পরিচালনা পর্ষদ বা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে এবং তারাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
সব মিলিয়ে নতুন নীতিমালার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে সরকার। তবে এই কাঠামো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে নীতিমালার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতার ওপর।

