এক সময়ে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু গত এক দশকে সেই ধারায় বড় ধরনের ভাটা পড়েছে। একই সময়ে চীনের বিনিয়োগ দ্রুতগতিতে বেড়ে এখন বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে বেড়ে চলা কূটনৈতিক তৎপরতা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন করে চাঙা হওয়ার আভাস দিচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে আসা মোট বিদেশি বিনিয়োগের প্রায় বাইশ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি অর্থ এসেছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে। কিন্তু ২০২৫ সাল শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে মোট বিনিয়োগের মাত্র সাড়ে পাঁচ শতাংশের সামান্য বেশি, অর্থাৎ প্রায় এক বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ের মধ্যে চীন থেকে আসা বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় সাত গুণ, যা সামগ্রিক চিত্রকেই বদলে দিয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাপ্রবাহ নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিশেষ দূতের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বৈঠক, বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ সতর্কতা শিথিল করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় পঁচিশটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় পঁয়তাল্লিশ জন জ্যেষ্ঠ নির্বাহীর সম্ভাব্য বাংলাদেশ সফর—এসব মিলিয়ে দুই দেশের বিনিয়োগ সম্পর্ক নতুন করে জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, অতীতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণেই মার্কিন বিনিয়োগ কার্যত থমকে গিয়েছিল।
বর্তমানে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক বাজার। যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি বৃহৎ খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ থেকে পণ্য কিনলেও শিল্প খাতে সরাসরি মার্কিন বিনিয়োগ এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত পর্যায়ে রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী দিনে কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা, ওষুধশিল্প, ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডেটা সেন্টার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি—এই খাতগুলোতেই যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বিনিয়োগের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সম্প্রতি জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে চালু হওয়া একটি নতুন প্রযুক্তি-অংশীদারত্ব উদ্যোগে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যুক্ত হতে পারে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের জন্য নতুন দুয়ার খুলতে পারে। এ ছাড়া অবকাঠামো, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে অর্থায়নের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন সংস্থার সঙ্গেও আলোচনা চলমান রয়েছে।
দেশের একটি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ গবেষক এ বিষয়ে বলেন, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ শুধু কর্মসংস্থান তৈরি করে না, বরং তা প্রযুক্তি হস্তান্তর ও রপ্তানি খাতের বহুমুখীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে তাঁর মতে, অবকাঠামো খাতে বিদেশি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ও জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার মতো বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়াই যুক্তিসংগত।
পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী, যিনি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠনের সাবেক পরিচালকও ছিলেন, বলেন যে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের বাংলাদেশ সফর বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তাঁর মতে, এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, বন্দরের সেবার মান বাড়ানো, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা কোনো বাধা ছাড়াই দেশে ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সার্বিকভাবে বিশ্লেষকদের অভিমত, বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রকৃত অর্থে বাড়াতে হলে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা সহজ করা, শিল্পের জন্য গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, শিল্প স্থাপনের জন্য দ্রুত জমি বরাদ্দের ব্যবস্থা করা, বিরোধ নিষ্পত্তিতে আইনের শাসন সুসংহত করা, শুল্ক ব্যবস্থাপনাকে যুগোপযোগী করা এবং প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি।

