দেশে মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের বেশি থাকলেও একের পর এক ব্যাংক আমানতের সুদের হার কমাতে শুরু করেছে। ফলে সঞ্চয়কারীরা আগের তুলনায় কম মুনাফা পাচ্ছেন, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের উচ্চ মূল্য তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতাকে আরও কমিয়ে দিচ্ছে। এতে আমানতের প্রকৃত রিটার্ন আরও সংকুচিত হচ্ছে।
ব্যাংকারদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন আমানত সংগ্রহের জন্য উচ্চ সুদ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে গেছে। কারণ ব্যাংকগুলোতে আমানতের প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী, অতিরিক্ত তারল্য জমেছে এবং ঋণের চাহিদাও আগের তুলনায় দুর্বল। ফলে ব্যাংকগুলো এখন তহবিল সংগ্রহের ব্যয় কমানোর দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতিগত পরিবর্তনও সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নীতিসুদ হ্রাসের পাশাপাশি ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশনা পাওয়ায় ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে আমানত ও ঋণ—উভয় ক্ষেত্রেই সুদের হার সমন্বয় করছে। তবে বাস্তবে প্রথম ধাক্কাটি পড়ছে আমানতের সুদের ওপর।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ট্রেজারি বিল ও সরকারি বন্ডের মুনাফার হার আগের তুলনায় কমে এসেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে এবং আমানতও সন্তোষজনক হারে বাড়ছে। তাই আমানতের ওপর বেশি সুদ দেওয়ার প্রয়োজন কমে গেছে। তার মতে, সামনের সময়ে আমানতের সুদের হার মূল্যস্ফীতির চেয়েও নিচে নেমে যেতে পারে।
তিনি আরও জানান, সুদের ব্যবধান নিয়ন্ত্রণে রাখার নির্দেশনার কারণে ব্যাংকগুলোকে ঋণ ও আমানতের সুদ—দুটিই কমাতে হচ্ছে। তবে সাধারণত আগে আমানতের সুদ কমানো হয়, এরপর ধীরে ধীরে ঋণের সুদের হার সমন্বয় করা হয়।
আরেক বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলীর মতে, গত কিছু সময় ধরে তুলনামূলক বেশি সুদের কারণে ব্যাংকগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নতুন আমানত সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। সেই কারণে এখন অনেক বড় বাণিজ্যিক ব্যাংকের হাতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অর্থ রয়েছে। কিন্তু একই সময়ে নতুন ঋণের চাহিদা প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। ফলে অতিরিক্ত আমানত টানার প্রয়োজন না থাকায় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমিয়ে আনছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী জানান, বর্তমানে গ্রাহকেরা শুধু বেশি সুদের লোভে ব্যাংক বেছে নিচ্ছেন না। বরং আর্থিকভাবে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য ব্যাংকেই অর্থ জমা রাখতে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। এই প্রবণতা শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর ওপর সুদের হার বেশি রাখার চাপ আরও কমিয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, তহবিল সংগ্রহের ব্যয় কমাতে পারলে ব্যাংকগুলো সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে, যা তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে সব ব্যাংকের পরিস্থিতি এক নয়। যেসব ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি তুলনামূলক দুর্বল, তাদের এখনো আমানত আকর্ষণের জন্য অপেক্ষাকৃত বেশি সুদ দিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যও ব্যাংকিং খাতে তারল্য বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরছে। চলতি বছরের মে মাস শেষে ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। এক বছর আগে একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উদ্বৃত্ত তারল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আমানতের সুদের হার কমে গেলে ব্যাংকগুলোর অর্থ সংগ্রহের ব্যয় কমলেও সঞ্চয়কারীরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন, বিশেষ করে যখন মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। কারণ মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম সুদ মানে সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য সময়ের সঙ্গে কমে যাওয়া।
তাদের মতে, ব্যাংকগুলোর জন্য তারল্য ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও একই সঙ্গে এমন একটি ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন, যাতে সঞ্চয়কারীরা ব্যাংকে অর্থ রাখার আগ্রহ না হারান। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চয়ের প্রবণতা দুর্বল হলে তা আর্থিক খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমানতের সুদ কমার পেছনে মূল কারণ মূল্যস্ফীতি নয়; বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অতিরিক্ত তারল্য, ঋণের সীমিত চাহিদা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নীতিগত নির্দেশনা। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত আমানতকারীদের প্রকৃত আয় কমতেই থাকবে, যা ভবিষ্যতে সঞ্চয় আচরণ এবং আর্থিক বাজার—উভয়ের ওপরই প্রভাব ফেলতে পারে।

