দেশে নগদবিহীন লেনদেন সম্প্রসারণের লক্ষ্যে চালু করা বাংলা কিউআর ব্যবস্থার ব্যবহার আশাব্যঞ্জক হারে বাড়ছে। ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একক কিউআর কোড ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার পর এই প্ল্যাটফর্মে লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
চলতি বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে এই মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছিল প্রায় দুইশ বারো কোটি টাকা, যা গত জুলাই মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় বারোশ পঞ্চাশ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র সাত মাসের ব্যবধানে এই লেনদেনের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ছয়গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থার দ্রুত বিস্তারের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় চল্লিশ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে এই প্ল্যাটফর্মে। এর আগের মাসগুলোতেও ধারাবাহিকভাবে এই প্রবৃদ্ধির চিত্র লক্ষ করা গেছে—জুনে মোট লেনদেন ছিল প্রায় আটশ পঁয়তাল্লিশ কোটি টাকা, মে মাসে প্রায় চারশ ঊনআশি কোটি, এপ্রিলে প্রায় একশ নিরানব্বই কোটি, মার্চে দুইশ ঊনত্রিশ কোটি এবং ফেব্রুয়ারিতে প্রায় দুইশ আঠারো কোটি টাকা।
ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও অভিন্ন করে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েক বছর আগে এই কিউআর ব্যবস্থা চালু করেছিল। পরবর্তীতে গত জুলাইয়ের শুরু থেকে সব ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের কিউআরভিত্তিক পেমেন্টকে এই অভিন্ন কাঠামোর আওতায় আনা বাধ্যতামূলক করা হয়। এর ফলে একজন গ্রাহক এখন একটিমাত্র কিউআর কোড স্ক্যান করেই যেকোনো অংশগ্রহণকারী ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করতে পারছেন, যা আগে সম্ভব ছিল না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে মোট সাঁইত্রিশটি প্রতিষ্ঠান এই নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নিবন্ধিত মোট মার্চেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় চব্বিশ লাখের বেশি, যেখানে মাত্র এক সপ্তাহ আগেও এই সংখ্যা ছিল প্রায় বাইশ লাখ। অর্থাৎ মাত্র সাত দিনের ব্যবধানেই নতুন করে প্রায় এক লাখ সত্তর হাজারের কাছাকাছি মার্চেন্ট এই নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছে, যা একটি চোখে পড়ার মতো প্রবৃদ্ধি।
মার্চেন্ট সংখ্যার বিচারে এখনো শীর্ষস্থানে রয়েছে দেশের একটি জনপ্রিয় মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকগুলোও নতুন কিউআর স্থাপনে যথেষ্ট সক্রিয়তা দেখিয়েছে। গত এক সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি নতুন কিউআর স্থাপন করেছে একটি ইসলামি ধারার ব্যাংক, যারা পঞ্চাশ হাজারের বেশি নতুন মার্চেন্ট যুক্ত করে তাদের মোট কিউআরের সংখ্যা দুই লাখের বেশি করেছে। একই সময়ে আরেকটি বেসরকারি ব্যাংক পঁয়তাল্লিশ হাজারের বেশি নতুন কিউআর স্থাপন করে তাদের মোট সংখ্যা সাড়ে তিন লাখের ঘরে নিয়ে গেছে।
এ ছাড়া বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন কিউআর স্থাপন করেছে, যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ব্যাংকের কয়েক হাজার থেকে শুরু করে কয়েক শ পর্যন্ত নতুন সংযোজন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, একটি মাত্র কিউআর কোডের মাধ্যমে সব ধরনের ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা থেকে মূল্য পরিশোধের সুযোগ তৈরি হওয়ায় ব্যবসায়ী ও গ্রাহক উভয়ের জন্যই লেনদেন প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়ে উঠেছে। আগে একটি দোকানে একাধিক প্রতিষ্ঠানের আলাদা আলাদা কিউআর কোড রাখতে হতো, কিন্তু এখন একটি কোডেই সব ধরনের ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে সামগ্রিকভাবে ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি মানুষের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বর্তমানে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনে মার্চেন্টের কাছ থেকে এক শতাংশ হারে একটি চার্জ কেটে নেওয়া হয়। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এই খরচের বোঝা কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি একশ কোটি টাকার একটি সহায়তা তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই উদ্যোগ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে বাংলা কিউআরের ব্যবহার আরও দ্রুত গতিতে বাড়বে, যা দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

