গত এক বছরে দক্ষিণ এশিয়া ও প্রতিবেশী দেশগুলোর মুদ্রার তুলনায় বাংলাদেশের টাকার মূল্য অনেকটাই স্থিতিশীল ছিল বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশের টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে মাত্র ০ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এ সময়ে তুলনামূলকভাবে আরও ভালো অবস্থানে ছিল শুধু কম্বোডিয়া, যেখানে দেশটির মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়েছে ০ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তুলনাভিত্তিক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবমূল্যায়নের মুখে পড়েছে ভারতের রুপি। আলোচ্য সময়ে ডলারের বিপরীতে দেশটির মুদ্রার মূল্য কমেছে ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এছাড়া শ্রীলঙ্কার রুপির অবমূল্যায়ন হয়েছে ৫ দশমিক ১১ শতাংশ, ফিলিপাইনের মুদ্রার ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার মুদ্রার ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
অন্যদিকে ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা গেছে চীনের ক্ষেত্রে। ডলারের বিপরীতে দেশটির মুদ্রার মূল্য ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়েছে, যা তুলনাভিত্তিক দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে পাকিস্তানের মুদ্রাও ০ দশমিক ৩৯ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, গত বছরের মে মাসে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা চালু করার পর বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে অস্থিরতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। একই সঙ্গে মুদ্রানীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত পূরণের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ গত বছরের মে মাসে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এরপর থেকে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে ধীরে ধীরে ভারসাম্য ফিরতে শুরু করে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আয় শক্তিশালী হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে। এর ফলে স্থানীয় মুদ্রার ওপর চাপ কিছুটা কমেছে। ৩০ জুলাই পর্যন্ত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২৪ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পরও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী ছিল। পাশাপাশি রপ্তানি আয় বাড়তে থাকায় রিজার্ভ পুনর্গঠনে ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।
গত এক বছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার সাধারণভাবে ১২২ থেকে ১২৩ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, যা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বাজারের ইঙ্গিত দেয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি বিল পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ডলারের ওপর চাপ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৪ আগস্ট আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে ১২৩ টাকা ৮১ পয়সা, যা কয়েক দিন আগে ছিল ১২৩ টাকা ৬৯ পয়সা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকলে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য এবং শিল্পের কাঁচামালের মতো আমদানিনির্ভর পণ্যের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। এর ইতিবাচক প্রভাব মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য আগামী দিনগুলোতে টাকার স্থিতিশীলতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

