দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। তবে এই আয়ের সিংহভাগই এখন এসে জমা হচ্ছে হাতেগোনা কয়েকটি দেশ থেকে। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে সৌদি আরব থেকে, যার পরিমাণ প্রায় ৫৮৫ কোটি মার্কিন ডলার। শীর্ষ পাঁচটি দেশের তালিকায় সৌদি আরবের পাশাপাশি রয়েছে যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি দেশভিত্তিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই তথ্য উঠে এসেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, এই শীর্ষ পাঁচ দেশ থেকেই এসেছে মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৬২ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে বলছেন, এত অল্প সংখ্যক দেশের ওপর এভাবে প্রবাসী আয়ের নির্ভরশীলতা দেশের অর্থনীতির জন্য একধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় সাড়ে ৩৫ হাজার কোটি ডলার, যা তার আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ বেশি। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা যুক্তরাজ্য থেকে এসেছে প্রায় ৫০৭ কোটি ডলার। এরপর যথাক্রমে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রায় ৪৫৮ কোটি, মালয়েশিয়া থেকে প্রায় ৩৪০ কোটি এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩০১ কোটি ডলার এসেছে। এই পাঁচ দেশ মিলিয়ে মোট আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ১৯২ কোটি ডলার, যা সামগ্রিক রেমিট্যান্সের প্রায় ৬২ শতাংশের সমান।
শীর্ষ পাঁচের বাইরে ইতালি, কুয়েত, ওমান, কাতার ও সিঙ্গাপুর থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রবাসী আয় এসেছে—এই পাঁচ দেশ থেকে এসেছে প্রায় ৮৯১ কোটি ডলার, যা মোট আয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। সবমিলিয়ে শীর্ষ দশটি দেশ থেকেই এসেছে দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৮৭ শতাংশ।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম অর্থনীতি ও শীর্ষ তেল রপ্তানিকারী দেশ সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। নির্মাণ, পরিবহন, সেবা এবং গৃহস্থালি খাতে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি নিয়মিতভাবে তাদের উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন, যে কারণে দীর্ঘদিন ধরেই রেমিট্যান্স আহরণে দেশটি শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।
দ্বিতীয় স্থানে থাকা যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন। সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদী অভিবাসী ও ব্যবসায়ী, যারা পরিবারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ এবং সামাজিক উন্নয়নেও অর্থ পাঠান। প্রবাসীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও উচ্চ দক্ষতা ও আয়ের কারণে এখান থেকে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিরা মূলত নির্মাণ, পরিবহন ও হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে যুক্ত, আর অনেকে সেখানে ছোট ব্যবসাও পরিচালনা করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এই দুই দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ায় সেখান থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহও যথেষ্ট বেড়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ আয়ের পেশায় নিয়োজিত প্রবাসী ও উদ্যোক্তাদের কল্যাণে সেখান থেকে আসা রেমিট্যান্সও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক ধারায় থাকার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ কাজ করছে—বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে সরকারি প্রণোদনা, অবৈধ হুন্ডি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি, ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর সুযোগ বৃদ্ধি, নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং দক্ষ কর্মী পাঠানোর সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমৃদ্ধ করে তা নয়, এটি আমদানি ব্যয় মেটাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে ভোগব্যয়, আবাসন খাতে বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে তোলা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও প্রবাসী আয়ের অবদান উল্লেখযোগ্য। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা, সেখানকার সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দেশে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি ভবিষ্যতে এই প্রবাহের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই দক্ষ কর্মী তৈরি, নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করা এবং বৈধ পথে অর্থ পাঠানো উৎসাহিত করার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক একজন প্রধান অর্থনীতিবিদ মন্তব্য করেন, মোট রেমিট্যান্সের অর্ধেকের বেশি অংশ মাত্র পাঁচটি দেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়া অর্থনৈতিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে কিছুটা উদ্বেগজনক। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মূলত অদক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সেখান থেকে আসা রেমিট্যান্স সবসময় স্থিতিশীল থাকে না। বিপরীতে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান তুলনামূলক মজবুত হওয়ায় সেখান থেকে আয় অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীলভাবে আসে।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, শীর্ষ পাঁচ দেশের অর্থনৈতিক নীতি বা শ্রমবাজার ব্যবস্থায় বড় কোনো পরিবর্তন এলে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক প্রবাসী আয়ের ওপর। তাই নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নতুন নতুন শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি বলে মত দেন তিনি।

