দেশে ব্যাংকিং সেবার পরিধি ক্রমাগত বাড়লেও আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় নারীদের অবস্থান এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। বিশেষ করে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে কমছে। অন্যদিকে, আমানতে নারীদের অংশ কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে নারীদের নামে থাকা আমানতের অংশ মোট গৃহস্থালি আমানতের ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই হার ছিল ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ, আর ২০২৫ সালের মার্চে ছিল ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সামান্য উন্নতি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে প্রবৃদ্ধির গতি প্রায় থেমে গেছে।
আমানত হিসাবের সংখ্যার দিক থেকেও খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। ২০২৬ সালের মার্চে মোট আমানত হিসাবের ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ ছিল নারীদের নামে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর এই হার ছিল ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের মার্চে ছিল ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ।
২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট গৃহস্থালি আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অঙ্কের মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণে বড় ধরনের অগ্রগতি না হওয়ায় বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিস্তার হলেও নারীদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না।
তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে ঋণ খাত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নারীদের নামে থাকা ঋণ হিসাবের হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২৬ সালের মার্চে মোট ঋণ হিসাবের ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল নারীদের নামে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ, আর ২০২৫ সালের মার্চে ছিল ২০ শতাংশ।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ হিসাবের অংশীদারিত্বে উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে। অথচ একই সময়ে দেশের মোট গৃহস্থালি ঋণ হিসাব বেড়ে ১ কোটি ৪১ লাখ ৭০ হাজারে পৌঁছেছে। এতে বোঝা যায়, সামগ্রিক ঋণ কার্যক্রম বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধির সুবিধা সমানভাবে নারীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
ঋণের পরিমাণের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মোট ২ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা গৃহস্থালি ঋণের মধ্যে নারীদের অংশ ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৫ সালের মার্চেও এই হার ছিল ২০ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ ঋণের পরিমাণে সামান্য পরিবর্তন হলেও নারীদের অংশগ্রহণ কার্যত স্থবির রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণের পরও নারীদের জন্য উৎপাদনমুখী অর্থায়নের পথ এখনও পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়নি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা নারীরা ব্যাংক ঋণ নিতে গিয়ে নানা ধরনের কাঠামোগত বাধার মুখে পড়ছেন।
তাদের মতে, জামানতের কঠোর শর্ত, ব্যবসার আনুষ্ঠানিক নথিপত্রের অভাব, প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়নের সুযোগ না থাকা এবং নারীদের জন্য উপযোগী আর্থিক পণ্যের সীমাবদ্ধতা এখনো বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। ফলে অনেক নারী উদ্যোক্তা আনুষ্ঠানিক ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে অনানুষ্ঠানিক উৎসের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।
নীতিনির্ধারক ও ব্যাংকারদের ভাষ্য, নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে শুধু ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ বাড়ালেই হবে না; উৎপাদনমুখী ঋণ পাওয়ার পথও সহজ করতে হবে। এজন্য নারী উদ্যোক্তাদের উপযোগী বিশেষ ঋণপণ্য চালু, জামানতের শর্তে নমনীয়তা, ঋণ নিশ্চয়তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে আরও বেশি নারীকে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তাদের মতে, আর্থিক শিক্ষার প্রসারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নারী প্রয়োজনীয় তথ্য, ব্যাংকিং প্রক্রিয়া কিংবা ঋণ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় আনুষ্ঠানিক অর্থায়ন থেকে দূরে থাকেন। এ কারণে আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও জোরদার করা দরকার।
বিশ্লেষকদের মতে, নারীদের ঋণপ্রাপ্তি বাড়ানো কেবল সামাজিক অন্তর্ভুক্তির বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। কারণ নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, পরিবারের আয় বৃদ্ধি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাই নারীদের জন্য সহজ, নিরাপদ ও বাস্তবমুখী অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় ব্যাংকিং খাতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সামগ্রিক অগ্রগতি সত্ত্বেও নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের এই বৈষম্য দীর্ঘদিন ধরে বহাল থাকার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

