দেশের ব্যাংক খাত গত দুই বছরে একদিকে যেমন নানা ধরনের সংস্কার কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং তারল্য সংকটের মতো সমস্যার ভার এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ফলে অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই খাত কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের মুখ দেখলেও সামগ্রিকভাবে এখনো একটি রূপান্তরের সময় পার করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার বর্তমান সংকট কোনো স্বল্পমেয়াদি সমস্যা নয়। দীর্ঘ সময় ধরে দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ এবং আর্থিক অনিয়মের যে প্রভাব জমা হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে ধারাবাহিক সংস্কার ও কার্যকর বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
সংস্কারের পথে নতুন উদ্যোগ
গত দুই বছরে ব্যাংক খাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু, খেলাপি ঋণ কমাতে নীতিগত সহায়তা, ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ এবং প্রয়োজনীয় আইন সংস্কারের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সংকটাপন্ন পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা, ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন এবং দেউলিয়া আইন আধুনিকায়নের মতো বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। উদ্দেশ্য একটাই—ব্যাংক খাতকে আরও স্থিতিশীল ও জবাবদিহিমূলক করা।
সংকটের পটভূমি
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছিল কঠিন চাপে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমছিল, ডলারের বাজার ছিল অস্থির, মূল্যস্ফীতি ছিল উচ্চ পর্যায়ে এবং অনেক ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়ে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করতেও হিমশিম খাচ্ছিল।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে সংশোধনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে বিভিন্ন বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তদন্ত, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী করার কাজ শুরু হয়।
দুই বছরে রিজার্ভে ১১ বিলিয়ন ডলারের বৃদ্ধি
ব্যাংক খাতের ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বৃদ্ধি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে দেশের মোট রিজার্ভ ছিল ২৫ বিলিয়ন ডলার। গত জুলাই শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ দুই বছরে রিজার্ভ বেড়েছে ১১ বিলিয়ন ডলার।
একই সময়ে ডলারের বাজারেও স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। ২০২৫ সালের ১৪ মে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত অনুযায়ী বাজারভিত্তিক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর খোলাবাজার ও আনুষ্ঠানিক দামের ব্যবধান কমে আসে। এর ফলে বৈধ পথে প্রবাসী আয় বাড়তে শুরু করে এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতারাও অর্থছাড়ে আগ্রহী হয়।
রেমিট্যান্সে রেকর্ড প্রবাহ
দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে ইতিবাচক পরিবর্তনগুলোর একটি এসেছে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে এসেছে ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি।
এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স ছিল ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আসে ২৩ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ২১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অবৈধ পথে অর্থ পাচারের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় বৈধ মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে ব্যাংকিং ব্যবস্থায়।
আমানত বেড়েছে, কিন্তু সব ব্যাংকে নয়
সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধিও বেড়েছে।
আগে যেখানে আমানত বৃদ্ধির হার ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে সাড়ে ১১ শতাংশে পৌঁছেছে।
তবে এই সুবিধা সব ব্যাংক সমানভাবে পায়নি। তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোতে নতুন আমানত বাড়লেও দুর্বল ব্যাংকগুলোর অনেকেই এখনো প্রতিদিনের জমা দিয়ে প্রতিদিনের উত্তোলন সামাল দিতে পারছে না। ফলে তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা অন্যান্য ব্যাংকের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তি
মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও কিছুটা উন্নতির চিত্র দেখা গেছে।
সরকার পরিবর্তনের সময় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। চলতি বছরের জুনে তা কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতিগত সুদহার কয়েক ধাপে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে ঋণের সুদ বেড়েছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ খেলাপি ঋণ
সংস্কারের মধ্যেও ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখনো খেলাপি ঋণ।
২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে প্রভিশন ঘাটতি ছিল ২৪ হাজার ৮১০ কোটি টাকা।
কিন্তু পরে প্রকৃত আর্থিক তথ্য প্রকাশ হতে শুরু করলে চিত্র আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে।
চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। একই সময়ে প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে হয়েছে দুই লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনেক অনিয়মিত ঋণকে নিয়মিত হিসেবে দেখানো হয়েছিল। প্রকৃত তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পরই সমস্যার প্রকৃত আকার সামনে এসেছে।
মূলধন সংকটও বাড়ছে
ব্যাংকগুলোর মূলধন পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেমে গেছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে।
অথচ আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত ব্যাসেল-৩ নীতিমালা অনুযায়ী এই হার অন্তত ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ হওয়ার কথা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর কোনো অর্থনীতিতে ব্যাংক খাতের মূলধন এমন ঋণাত্মক অবস্থায় চলে যাওয়া অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং এটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করে।
সমস্যাগ্রস্ত ঋণ অর্ধেকের বেশি
ব্যাংক খাতে সমস্যাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
২০২৫ সালের শেষে মোট ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, পুনঃতফসিলের পরও অনাদায়ী চার লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা এবং অবলোপন করা অনাদায়ী ঋণ ৮৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে সমস্যাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় আকারের সমস্যাগ্রস্ত ঋণ ব্যাংকিং খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।
সামনে কী করণীয়?
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তাদের মতে, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর উদ্যোগ, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে ধীরে ধীরে ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরবে।
তারা আরও মনে করেন, গত দুই বছরে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের সংকট কাটাতে আরও কয়েক বছর লাগতে পারে। তাই সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন এই খাতের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার প্রধান শর্ত।
প্রয়োজনে এটিকে আরও সংবাদধর্মী, ব্লগ-স্টাইল বা অনুসন্ধানী বিশ্লেষণধর্মী রূপেও সাজিয়ে দিতে পারি।

