ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে যেমন প্রয়োজনের সময় তা কাজে আসে, গবেষকদের একাংশ বলছেন ঘুমের ক্ষেত্রেও নাকি একই নিয়ম প্রযোজ্য। আগেভাগে বাড়তি ঘুমিয়ে নিলে পরবর্তীতে রাত জাগতে হলে শরীর ও মনের ওপর তার প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে দাবি করছেন তারা।
ছুটির দিনের সকাল। অ্যালার্ম বন্ধ করে দিয়ে লেপ মুড়ি দিয়ে আরও কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার এই সুযোগটা অনেকেই কাজে লাগান সপ্তাহজুড়ে জমে থাকা ঘুমের ঘাটতি পোষাতে। কিন্তু বিষয়টি যদি উল্টো দিক থেকে দেখা হয়? ধরুন সামনে আসছে খুব ব্যস্ত একটা সময়, যখন ঠিকমতো ঘুমানোর ফুরসতই মিলবে না। সেই ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কি আগে থেকেই বাড়তি ঘুম জমিয়ে রাখা সম্ভব? এই ধারণাটিকেই বলা হচ্ছে ‘স্লিপ ব্যাংকিং’।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ঘুমের ঘাটতির সময় আসার আগেই টানা কয়েক রাত স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় ঘুমিয়ে নেওয়াই এই কৌশলের মূল কথা। গবেষকদের একাংশের মতে, এটি বেশ কার্যকর একটি পদ্ধতি হতে পারে। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এভাবে ঘুমালে মস্তিষ্ক প্রয়োজনীয় শক্তি আগে থেকেই সঞ্চয় করে রাখে, ফলে পরবর্তীতে ঘুমের ঘাটতি দেখা দিলেও মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা তুলনামূলক ভালো থাকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাস্থ্যসচেতন ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই ধারণাটি বর্তমানে বেশ আলোচিত। দীর্ঘ ভ্রমণ কিংবা কোনো বড় কাজের আগে অনেকেই একে এক ধরনের সুরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে অনুসরণ করার পরামর্শ দিচ্ছেন।
এই ধারণাটি প্রথম সামনে আসে প্রায় দেড় দশক আগে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একদল গবেষকের একটি পরীক্ষার মাধ্যমে। সেই পরীক্ষায় সেনাসদস্যদের দুটি দলে ভাগ করা হয়—একদলকে রাতে সাত ঘণ্টা এবং অন্য দলকে দশ ঘণ্টা বিছানায় থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। এরপরের সপ্তাহে উভয় দলের ঘুমের সময় কমিয়ে মাত্র তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা হয়।
ফলাফল ছিল বেশ চমকপ্রদ। যারা আগেভাগে দশ ঘণ্টা করে ঘুমিয়ে নিয়েছিলেন, তারা কম ঘুমের ধকল অনেক ভালোভাবে সামলাতে পেরেছিলেন এবং তাদের মনোযোগ ও সতর্কতা অন্য দলের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো ছিল।
পরবর্তীতে আরও কিছু গবেষণায়ও একই ধরনের সুফল দেখা গেছে। একটি হাসপাতালে নাইট শিফটে কর্মরত চিকিৎসকদের নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিফট শুরুর আগে তিন রাত অতিরিক্ত ঘুমানোর ফলে তাদের কর্মক্ষমতা বেড়েছে। খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ফল মিলেছে—রাগবি খেলোয়াড়রা কয়েক সপ্তাহ বাড়তি ঘুমিয়ে শারীরিক ধকল কমিয়েছেন, টেনিস খেলোয়াড়দের সার্ভ করার দক্ষতা বেড়েছে এবং বাস্কেটবল খেলোয়াড়দের ক্ষিপ্রতা ও লক্ষ্যভেদের সক্ষমতাও উন্নত হয়েছে।
তবে এই তত্ত্বের সঙ্গে সবাই একমত নন। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, শরীরের পক্ষে ভবিষ্যতের জন্য ঘুম সত্যিকার অর্থে জমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আমরা যখন বাড়তি ঘুমাই, তখন হয়তো ভবিষ্যতের জন্য কিছু জমাচ্ছি না, বরং অতীতের ঘুমের ঘাটতিই পুষিয়ে নিচ্ছি।
একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ব্যাখ্যা করেন, ঘুমের সময় শরীরে গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রক্রিয়া চলতে থাকে—হরমোন ও বিপাকীয় সমস্যার সমাধান হয় এই সময়েই, আর মস্তিষ্কের জন্য এটি চিন্তাভাবনা গুছিয়ে নেওয়ার সময়। আরেকজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ জানান, শরীরের কোটি কোটি কোষ মেরামতের জন্য ঘুম অপরিহার্য এবং সারাদিনে মস্তিষ্ক ও শরীরে জমে থাকা বর্জ্য ঘুমের সময়েই পরিষ্কার হয়ে যায়।
প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন হয় বলে জানান তিনি। পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পেলে মস্তিষ্ক বর্জ্য পরিষ্কার করতে পারে না, ফলে পরদিন মনোযোগ ধরে রাখা বা নতুন কিছু শেখা কঠিন হয়ে পড়ে।
যারা এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে চান, তাদের জন্য পরামর্শ হলো—ব্যস্ত সময় শুরুর এক-দুই সপ্তাহ আগে থেকে প্রতি রাতে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩০ থেকে ৬০ মিনিট বেশি ঘুমানো। সকালে অ্যালার্ম কিছুটা দেরিতে দেওয়া বা একটু বেশি সময় ঘুমানো তুলনামূলক সহজ, কারণ মানুষ সাধারণত আগে ঘুমাতে যাওয়ার চেয়ে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তবে যাদের সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে হয়, তাদের জন্য রাতে আগেভাগে ঘুমাতে যাওয়াই ভালো বিকল্প বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া দিনের বেলা অল্প সময়ের জন্য ঘুমিয়ে নেওয়াও একটি কার্যকর উপায় হতে পারে।
তবে সব বিশেষজ্ঞই এই ধারণার সঙ্গে একমত নন। একজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ এই তুলনাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন—তার মতে, ঘুম পিগি ব্যাংকের মতো নয়, বরং ক্রেডিট কার্ডের মতো। অর্থাৎ ঘুমের ঋণ করা সম্ভব, কিন্তু আগে থেকে জমিয়ে উদ্বৃত্ত রাখা সম্ভব নয়। তার মতে, ক্লান্ত না হলে মানুষ ঘুমাতেই পারে না।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ধারণাকে কার্যকর ভেবে যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়মিত কম ঘুমানো শুরু করেন, তবে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে দিনের বেলা ঘুমানোর ব্যাপারেও তিনি সতর্ক করেছেন, কারণ এতে ঘুম থেকে ওঠার পর মাথা ভারী হয়ে থাকার একটি সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ঘুম ভবিষ্যতের জন্য জমানো হোক বা অতীতের ঘাটতি পূরণ—রাতে সামান্য বাড়তি ঘুম শরীরের জন্য উপকারী বলেই মনে হচ্ছে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে। তবে তারা একই সঙ্গে সতর্ক করে বলছেন, এই পদ্ধতিকে দীর্ঘমেয়াদী কোনো সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়, কারণ ঘুমের সব সমস্যার সমাধান এর মাধ্যমে মিলবে না। তাদের পরামর্শ, দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে হলে নিয়মিত একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তোলাই সবচেয়ে বিচক্ষণ উপায়।

