জাতীয় বেতন স্কেলের আওতাভুক্ত বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, বাহিনী ও সংস্থার কর্মীদের ঝুঁকি, বিশেষ, সীমান্ত ও ক্ষতিপূরণ ভাতা পুনর্নির্ধারণ করেছে সরকার। নতুন হারে এসব ভাতা কার্যকর হবে ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে। তবে তার আগে অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মীরা প্রচলিত নিয়ম ও আগের সরকারি আদেশ অনুযায়ী ভাতা পেতে থাকবেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী বিভিন্ন পদ ও চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে নতুন ভাতার হার নির্ধারণ করে একাধিক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। ১৭ সেপ্টেম্বর তারিখে জারি করা এসব প্রজ্ঞাপন বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হয়।
নতুন সিদ্ধান্তের আওতায় নিরাপত্তা বাহিনী থেকে শুরু করে সীমান্তরক্ষী, অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকর্মী, কারা অধিদপ্তর, আনসার-ভিডিপি, কোস্ট গার্ড, বিশেষ প্রতিক্রিয়া ব্যাটালিয়ন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কর্মীরা রয়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব, বিশেষ দায়িত্ব কিংবা নির্দিষ্ট ধরনের সরকারি কাজে নিয়োজিত কর্মীদের জন্য ভাতার পরিমাণ নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিশেষ ভাতা ও ওই বাহিনীর অন্যান্য কর্মীদের ক্ষতিপূরণ ভাতা ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যে হারে তারা ভাতা পেতেন, সেই অঙ্কের ভিত্তিতেই এই ২০ শতাংশ বৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের সামরিক ও বেসামরিক কর্মীদের বিশেষ ভাতাও ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
তবে নতুন ভাতার হিসাব জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর মূল বেতনের নির্দিষ্ট শতাংশ হিসেবে করা হবে না। অর্থাৎ মূল বেতন বাড়লে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব ভাতা একই হারে বাড়বে না। আবার কোনো কর্মী প্রেষণে গিয়ে সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা সংস্থার জন্য নির্ধারিত ভাতা পেলে তিনি একই সঙ্গে অন্য কোনো ঝুঁকি, বিশেষ, ক্ষতিপূরণ কিংবা প্রতিরক্ষা সেবা ভাতা পাওয়ার যোগ্য হবেন না।
সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কর্মীদের জন্যও নতুন সীমান্ত ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে। সুবেদার মেজর এবং তার নিচের পদমর্যাদার সদস্যরা বেতন গ্রেড ও চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে এই ভাতা পাবেন। চাকরির মেয়াদকে পাঁচটি ধাপে ভাগ করে ভাতার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০তম গ্রেডের কর্মীদের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের কম চাকরির জন্য মাসিক ভাতা হবে ১,৪৪০ টাকা। ২০ বছর বা তার বেশি চাকরির ক্ষেত্রে এই ভাতা বেড়ে হবে ৩,১২০ টাকা। ১৯তম গ্রেডে এই হার ১,৫৬০ টাকা থেকে ৩,২৪০ টাকা, ১৮তম গ্রেডে ১,৬৮০ টাকা থেকে ৩,৩৬০ টাকা এবং ১৭তম গ্রেডে ১,৮০০ টাকা থেকে ৩,৬০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
১৬ থেকে ১৩তম গ্রেডের ক্ষেত্রে ভাতার পরিমাণ যথাক্রমে ১,৯২০ টাকা থেকে ৩,৮৪০ টাকা, ২,০৪০ টাকা থেকে ৪,০৮০ টাকা, ২,১৬০ টাকা থেকে ৪,৫৬০ টাকা এবং ২,২৮০ টাকা থেকে ৪,৮০০ টাকা পর্যন্ত হবে।
১২ থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেডের কর্মীদের ক্ষেত্রেও চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী ভাতার পরিমাণ ধাপে ধাপে বাড়বে। এসব গ্রেডে ভাতার হার যথাক্রমে ২,৫২০ টাকা থেকে ৫,২৮০ টাকা, ২,৬৪০ টাকা থেকে ৫,৫২০ টাকা, ২,৭৬০ টাকা থেকে ৫,৬৪০ টাকা, ২,৮৮০ টাকা থেকে ৬,০০০ টাকা, ৩,০০০ টাকা থেকে ৬,২৪০ টাকা, ৩,১২০ টাকা থেকে ৬,৩৬০ টাকা এবং ৩,২৪০ টাকা থেকে ৬,৪৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অগ্নিনির্বাপণ ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা অধিদপ্তরের ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মীদের জন্যও ভাতা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ১০ম থেকে ১৮তম গ্রেড এবং সমপর্যায়ের পদে কর্মরতদের নতুন হারে এই ভাতা দেওয়া হবে।
১৮তম গ্রেডের কর্মীরা চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী মাসে ১,৬৮০ টাকা থেকে ৩,৩৬০ টাকা পাবেন। ১৭তম গ্রেডে এই হার ১,৮০০ টাকা থেকে ৩,৬০০ টাকা। ১৬তম ও ১৫তম গ্রেডের জন্য যথাক্রমে ১,৯২০ টাকা থেকে ৩,৮৪০ টাকা এবং ২,০৪০ টাকা থেকে ৪,০৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
১৪তম থেকে ১০ম গ্রেডে ভাতার পরিমাণ হবে যথাক্রমে ২,১৬০ টাকা থেকে ৪,৫৬০ টাকা, ২,২৮০ টাকা থেকে ৪,৮০০ টাকা, ২,৫২০ টাকা থেকে ৫,২৮০ টাকা, ২,৬৪০ টাকা থেকে ৫,৫২০ টাকা এবং ৩,২৪০ টাকা থেকে ৬,৪৮০ টাকা।
কারা অধিদপ্তরের কর্মীদের ঝুঁকি ভাতাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। উপকারারক্ষী এবং তার নিচের পদগুলোর কর্মীদের চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী পাঁচটি ধাপে নতুন ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে।
১৭তম গ্রেডের কারারক্ষী, নারী কারারক্ষী ও দেহরক্ষীরা মাসে ১,৮০০ টাকা থেকে ৩,৬০০ টাকা পর্যন্ত ভাতা পাবেন। ১৬তম গ্রেডের সহকারী প্রধান কারারক্ষীদের জন্য এই হার ১,৯২০ টাকা থেকে ৩,৮৪০ টাকা। ১৫তম গ্রেডের প্রধান কারারক্ষী ও নারী তত্ত্বাবধায়কদের ভাতা হবে ২,০৪০ টাকা থেকে ৪,০৮০ টাকা।
১৪তম গ্রেডের প্রধান কারারক্ষীদের জন্য ভাতা ২,১৬০ টাকা থেকে ৪,৫৬০ টাকা, ১৩তম গ্রেডের সার্জেন্ট প্রশিক্ষকদের জন্য ২,২৮০ টাকা থেকে ৪,৮০০ টাকা এবং ১১তম গ্রেডের উপকারারক্ষীদের জন্য ২,৬৪০ টাকা থেকে ৫,৫২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর নয়টি শ্রেণির কর্মীর জন্যও নতুন ঝুঁকি ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৯তম গ্রেডের অস্ত্র মেরামতকারীদের জন্য ভাতা ১,৫৬০ টাকা থেকে ৩,২৪০ টাকা এবং ১৮তম গ্রেডের ব্যাটালিয়ন আনসার ও সিপাহিদের জন্য ১,৬৮০ টাকা থেকে ৩,৩৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কর্মীদের জন্য পদমর্যাদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট ঝুঁকি ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে। মাসিক হিসেবে এমসিপিও পদে ৩,৮৪০ টাকা, এসসিপিও পদে ৩,০০০ টাকা, সিপিও পদে ২,৭৬০ টাকা এবং পিও পদে ২,৬৪০ টাকা পাওয়া যাবে।
এলএস পদে কর্মরতদের জন্য ভাতা ২,২৮০ টাকা, এবি ও লিডিং পদে ২,১৬০ টাকা, ওডি পদে ১,৮০০ টাকা এবং প্রশিক্ষণরত নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য ১,৭৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষ প্রতিক্রিয়া ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তা ও কর্মীদের জন্যও নতুন বিশেষ ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে। মহাপরিচালক মাসে ২৮,৮০০ টাকা, অতিরিক্ত মহাপরিচালক ২৬,৪০০ টাকা এবং পরিচালক ১৯,২০০ টাকা বিশেষ ভাতা পাবেন।
উপপরিচালক, নির্বাহী প্রকৌশলী ও পদ্ধতি বিশ্লেষকদের জন্য মাসিক ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫,৬০০ টাকা। জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক, জালপ্রশাসক, আইন কর্মকর্তা ও কম্পিউটার কর্মসূচি প্রণয়নকারীরা পাবেন ১২,০০০ টাকা। সহকারী পরিচালকসহ কয়েকটি পদে ভাতার পরিমাণ হবে ১০,২০০ টাকা।
সার্জেন্ট, উপপরিদর্শক ও সহকারী উপপ্রকৌশলীরা ৭,২০০ টাকা, ধর্মীয় শিক্ষকরা ৬,৬০০ টাকা এবং সহকারী উপপরিদর্শক, নগদরক্ষক ও হিসাবরক্ষকরা ৪,৮০০ টাকা বিশেষ ভাতা পাবেন। কনস্টেবল ও রান্নার কাজে নিয়োজিত কনস্টেবলরা পাবেন ৩,৯৬০ টাকা। দপ্তর সহকারীসহ কয়েকটি পদে সর্বোচ্চ ৩,৬০০ টাকা পর্যন্ত ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মীদের ঝুঁকি ভাতাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ১০ম গ্রেডের কর্মীরা চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী মাসে ৩,২৪০ টাকা থেকে ৬,৪৮০ টাকা পর্যন্ত পাবেন। ১১তম গ্রেডে এই হার ২,৬৪০ টাকা থেকে ৫,৫২০ টাকা।
১২তম গ্রেডে ভাতা ২,৫২০ টাকা থেকে ৫,২৮০ টাকা, ১৩তম গ্রেডে ২,২৮০ টাকা থেকে ৪,৮০০ টাকা এবং ১৪তম গ্রেডে ২,১৬০ টাকা থেকে ৪,৫৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৫ থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রেও পদ ও চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী নতুন হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর বাইরে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা, পূর্ব ও পশ্চিম সুন্দরবন বন বিভাগ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কুষ্ঠ ও যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নির্দিষ্ট কর্মী এবং আইন ও সংসদবিষয়ক বিভাগের কর্মীদের জন্যও ঝুঁকি ও বিশেষ ভাতা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কুষ্ঠ ও যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত কর্মী এবং নির্ধারিত উপজেলা ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মীরা মাসে ৯০০ টাকা ঝুঁকি ভাতা পাবেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর অর্থ ও ব্যবস্থাপনা তথ্য শাখার প্রকাশনা অংশে মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ের কাজে সরাসরি যুক্ত ১৩তম থেকে ১৭তম গ্রেডের নির্ধারিত কর্মীরা মাসে ২৪০ টাকা ঝুঁকি ভাতা পাবেন।
নতুন ভাতা কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর কার্যকর হওয়ার সময়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সব ক্ষেত্রেই সংশোধিত ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কার্যকর হবে। তার আগে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মীরা আগের নিয়ম ও অর্থ বিভাগের পূর্ববর্তী আদেশ অনুযায়ী ভাতা পাবেন।
অর্থাৎ নতুন সিদ্ধান্তে এখনই ভাতার পরিমাণ পরিবর্তন হচ্ছে না। বরং ২০২৮ সাল থেকে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ, সীমান্তবর্তী, নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট ও বিশেষ দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মীদের জন্য নতুন হারে ভাতা কার্যকর হবে। পদ, বেতন গ্রেড এবং চাকরির মেয়াদের পার্থক্যের কারণে একেক বাহিনী ও সংস্থার কর্মীদের ভাতার পরিমাণও আলাদা রাখা হয়েছে।

