মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ সুদহারের নীতি অনুসরণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এবার সেই কঠোর অবস্থান নিয়েই নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নীতিনির্ধারকদের মতে, মুদ্রানীতি অতিরিক্ত কঠোর রাখার ফলে মূল্যস্ফীতি কমানোর যে সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, তার তুলনায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ক্ষতির আশঙ্কা এখন বেশি হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকের কার্যবিবরণীতে এমন অবস্থানের প্রতিফলন পাওয়া গেছে। ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে কমিটি নীতিসুদহার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করার সুপারিশ করে। একই দিন বাংলাদেশ ব্যাংক সেই সুপারিশ কার্যকর করে। এর ফলে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ১০ শতাংশে স্থির থাকা নীতিসুদহার কমে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে।
ছয় বছর পর প্রথমবারের মতো নীতিসুদহার কমানোর সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দুর্বলতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির মতে, দেশে মূল্যস্ফীতি এখনো মধ্যমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি। কিন্তু একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল, বেসরকারি বিনিয়োগ কম এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় মুদ্রানীতি অত্যন্ত কঠোর রাখলে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাই বেশি।
গত প্রায় দুই বছর ধরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সুদহার বাড়িয়ে রেখেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে নীতিসুদহার ১০ শতাংশে রাখা হয়। এর আগে ধাপে ধাপে সুদহার বাড়ানো হয়েছিল, যাতে ব্যাংক ঋণের প্রবাহ কমে এবং বাজারে অতিরিক্ত অর্থের চাপ কমানো যায়।
এই নীতির কিছু সুফলও পেয়েছে অর্থনীতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে কঠোর মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক খাতের পরিস্থিতির উন্নতি, বিনিময় হার স্থিতিশীল করা এবং মুদ্রানীতির কার্যকারিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এই নীতি ভূমিকা রেখেছে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, পরিস্থিতি এখন বদলেছে। বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি অনেকটাই স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামও তুলনামূলক স্থিতিশীল। একই সঙ্গে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থার কারণে টাকা ও ডলারের বিনিময় হারও আগের তুলনায় স্থিতিশীল রয়েছে।
এর ফলে আগের মতো আমদানি ব্যয়ের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে না। অর্থাৎ বাইরে থেকে আসা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে। এখন দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সমস্যা ও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতাই মূল্যস্ফীতির বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
মুদ্রানীতি কমিটির মতে, খাদ্য সরবরাহে বাধা, জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিয়ন্ত্রিত মূল্য, বাজারের অদক্ষতা এবং পণ্য সরবরাহের বিভিন্ন স্তরে প্রতিবন্ধকতার কারণে দেশে মূল্যস্ফীতি স্থায়ী হচ্ছে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত সামগ্রিক চাহিদার সম্পর্ক আগের তুলনায় কম।
এই বাস্তবতায় আরও সুদহার বাড়ালে মূল্যস্ফীতি কমানোর অতিরিক্ত সুবিধা খুব বেশি পাওয়া যাবে না। বরং ঋণের খরচ বাড়বে, বিনিয়োগ আরও কমবে, উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির দুর্বলতা ইতিমধ্যেই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সুদহার এবং জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা ব্যবসায়ীদের নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন বাড়াতে চাইলেও ঋণের উচ্চ খরচ এবং জ্বালানি সংকট তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে শুধু মূল্যস্ফীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সমস্যার অন্য দিকটি উপেক্ষিত থেকে যেতে পারে। কারণ বিনিয়োগ কমে গেলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। উৎপাদন কমলে ব্যবসার আয় কমে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব আবার রাজস্ব আদায় থেকে শুরু করে মানুষের আয় ও ভোগের ওপরও পড়তে পারে।
এই ভারসাম্যের বিষয়টিই এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব পাচ্ছে।
মুদ্রানীতি কমিটি মনে করছে, ১০ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে নীতিসুদহার কমালে মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি সীমিত থাকবে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছুটা গতি ফেরানোর সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পুনরুদ্ধারকেও সমান গুরুত্ব দিতে চাইছে। এটি আগের অবস্থানের তুলনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
তবে নীতিসুদহার কমলেই যে অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় অংশ যদি সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা থেকে তৈরি হয়, তাহলে শুধু সুদহার কমিয়ে সেই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।
খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, পণ্য পরিবহনের বাধা কমানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপও প্রয়োজন হবে। অন্যথায় সুদহার কমলেও উৎপাদন খরচ ও পণ্যের দাম কমার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।
অন্যদিকে সুদহার কমানোর ফলে ব্যাংক ঋণের খরচ কিছুটা কমার সুযোগ তৈরি হলে বেসরকারি বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির থাকা শিল্প খাত নতুন বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহী হতে পারে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়লে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানেও গতি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এখানে আরেকটি ঝুঁকিও রয়েছে। মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ওপরে থাকায় অতিরিক্ত দ্রুত সুদহার কমানো হলে বাজারে অর্থের প্রবাহ বেড়ে আবারও মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—কত দ্রুত এবং কতটা সুদহার কমানো নিরাপদ হবে।
জুনে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে, যা মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কমলেও তা এখনো সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ শতাংশের ওপরে রয়েছে।
তাই মুদ্রানীতি কমিটির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াই থেকে পুরোপুরি সরে আসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং পরিস্থিতি বিবেচনায় কঠোর নীতি থেকে কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ নীতিতে যাওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা যায়।
এদিকে মুদ্রানীতি নির্ধারণের সময়সূচি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে কমিটি। দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে নীতিকে আরও কার্যকরভাবে সামঞ্জস্য করতে বছরে দুইবারের পরিবর্তে প্রতি তিন মাস অন্তর মুদ্রানীতি নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
এই পরিবর্তন কার্যকর হলে বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার, বিনিয়োগ, ঋণপ্রবাহ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন দ্রুত বিবেচনায় নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক অবস্থান থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—শুধু মূল্যস্ফীতি কমানো এখন আর একমাত্র লক্ষ্য নয়। দীর্ঘ সময়ের কঠোর মুদ্রানীতিতে অর্থনীতির যে অংশগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে, সেগুলোতেও গতি ফেরানোর প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
তবে নীতিসুদহার কমানোর সুফল কতটা বাস্তবে পৌঁছাবে, তা নির্ভর করবে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ, ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত, জ্বালানি সরবরাহ এবং সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতির ওপর। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ নতুন করে বাড়ছে কি না, সেটিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য তাই সামনে মূল কাজ হবে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য তৈরি করা—একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ সুদ ও দুর্বল ঋণপ্রবাহের কারণে যাতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার আরও পিছিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা। ৯ দশমিক ৫ শতাংশে নীতিসুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত সেই ভারসাম্য তৈরির প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

