দেশের দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র বের করতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, ঋণ বিতরণে অনিয়ম এবং তারল্যসংকটে থাকা ১১টি ব্যাংকের সম্পদের মান যাচাই করতে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। আগামী জানুয়ারি থেকে এসব ব্যাংকে শুরু হবে এই বিস্তৃত যাচাই প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে যোগ্য আন্তর্জাতিক পরামর্শ ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আগ্রহপত্র আহ্বান করেছে। জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৩১ আগস্ট ২০২৬ বেলা ৩টার মধ্যে আগ্রহপত্র জমা দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসাইন খান জানিয়েছেন, ধাপে ধাপে আরও ব্যাংককে এই যাচাই প্রক্রিয়ার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে ছয়টি ব্যাংকের সম্পদের মান যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। নতুন করে আরও কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য যাচাইয়ের পর প্রতিটি ব্যাংকের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হবে।
এই উদ্যোগের গুরুত্ব বুঝতে হলে দেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকানো জরুরি। বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। এটি মোট ১৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ ঋণ দিয়েছে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে।
দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ১৭টির খেলাপি ঋণের হার ৫০ শতাংশের বেশি। একই সময়ে ২৩টি ব্যাংক মিলিয়ে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। ফলে শুধু খেলাপি ঋণ নয়, ব্যাংকগুলোর মূলধন সক্ষমতা এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার ক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
শুধু খেলাপি ঋণ নয়, যাচাই হবে ব্যাংকের পুরো আর্থিক সক্ষমতা
নতুন এই যাচাই কার্যক্রমকে কেবল খেলাপি ঋণের হিসাব নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না। প্রতিটি ব্যাংকের মোট সম্পদের অন্তত ৮০ শতাংশ পরীক্ষা করা হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধিবিধান অনুযায়ী ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ রেখেছে কি না, বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণে নিয়ম মানা হয়েছে কি না এবং একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত ঋণ যথাযথভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে কি না, সেসবও দেখা হবে।
ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যে তথ্য দিয়েছে, তার যথার্থতাও যাচাই করবেন নিরীক্ষকেরা। প্রয়োজন হলে ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পদের মূল্যও স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা হবে।
এর ফলে কোনো ব্যাংক কাগজে-কলমে যে আর্থিক অবস্থার কথা দেখাচ্ছে, বাস্তবে তার অবস্থা কতটা শক্তিশালী—সেটি বোঝার সুযোগ তৈরি হবে।
যাচাইয়ের আওতায় ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং পরস্পর-সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে ঋণ দেওয়ার বিষয়ও খতিয়ে দেখা হবে। ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক মূলধন এবং প্রথম স্তরের মূলধন পর্যাপ্ত কি না, সেটিও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরীক্ষা করা হবে।
শুধু বর্তমান পরিস্থিতি দেখেই থেমে থাকবেন না নিরীক্ষকেরা। আগামী তিন বছরের সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন ধরনের চাপের পরীক্ষাও করা হবে। স্বাভাবিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কতটা ঝুঁকি সামলাতে পারবে, সেটিও মূল্যায়ন করা হবে।
ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত নগদ ও সহজে ব্যবহারযোগ্য অর্থ রয়েছে কি না, তাও গুরুত্বপূর্ণভাবে দেখা হবে। এর মধ্যে নগদ অর্থের নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সক্ষমতা যাচাই করা হবে। পাশাপাশি প্রতারণা, জালিয়াতি এবং বেআইনি ঋণ বিতরণের ঘটনা শনাক্ত করতে বিশেষ তদন্তও চালানো হবে।
নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে কাজ শুরুর পর প্রাথমিক প্রতিবেদন, মাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন এবং শেষ পর্যন্ত বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন বিদেশে অবস্থানরত প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ অংশীদারের স্বাক্ষরিত হতে হবে।
জানুয়ারি থেকে শুরু, সময়সীমা ১২০ দিন
নির্বাচিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আগামী জানুয়ারি ২০২৭ থেকে কাজ শুরু করবে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১২০ পঞ্জিকা দিনের মধ্যে পুরো কাজ শেষ করার কথা রয়েছে।
এ ধরনের কাজের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোরও নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১৫ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এর মধ্যে সম্পদের মান যাচাই, ব্যাংক তদারকি অথবা ঋণঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দলে হিসাববিদ, আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, অর্থপাচার প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং মূলধন কাঠামো বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের থাকতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত আর্থিক খাত সহায়তা প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় থেকে এই উদ্যোগের অর্থায়ন করা হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা।
আগের যাচাইয়ে বেরিয়ে এসেছিল বড় অনিয়ম
বাংলাদেশ ব্যাংক এর আগে ছয়টি ব্যাংকের সম্পদের মান যাচাই করতে আন্তর্জাতিক দুটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়েছিল।
এর মধ্যে এক প্রতিষ্ঠান এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের সম্পদের মান পরীক্ষা করে। অন্য প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের যাচাই করে।
ওই যাচাইয়ের পর পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। অন্যদিকে আইসিবি ইসলামী ব্যাংক এখনো বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়োগ করা প্রশাসকের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদনে ছয়টি ব্যাংকেই ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৫০ শতাংশ থেকে ৯৫ শতাংশের মধ্যে।
একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে চারটির নিয়ন্ত্রণে ছিল এস আলম গ্রুপ। অন্যদিকে এক্সিম ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার।
ফলে নতুন করে ১১টি ব্যাংকের সম্পদের মান যাচাইয়ের সিদ্ধান্তকে শুধু নিয়মিত তদারকি হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং আগের যাচাইয়ে যে ধরনের অনিয়ম ও আর্থিক দুর্বলতা সামনে এসেছে, নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে আরও বিস্তৃতভাবে সেসব সমস্যা শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ব্যাংক খাতে চাপ ক্রমেই বাড়ছে
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূলধন ঘাটতি এবং তারল্যসংকট। ফলে কোনো কোনো ব্যাংকের জন্য শুধু নতুন ঋণ বিতরণই নয়, পুরোনো আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
সরকারি পুনর্গঠন পরিকল্পনার আওতায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে পুনর্মূলধনীকরণের মাধ্যমে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে শেয়ার বা মালিকানা কাঠামোর মাধ্যমে আসার কথা।
ব্যাংক একীভূতকরণ ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় তারল্য সহায়তা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার একটি বীমা ট্রাস্ট তহবিলও গঠন করেছে। এরই মধ্যে এই তহবিল থেকে ৩ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে আরও সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক্সিম ব্যাংকের প্রশাসককে ইতিমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। অন্য ব্যাংকগুলোর প্রশাসকদেরও ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর মাধ্যমে মূলত ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক পরিচালনা ফিরিয়ে আনা, আমানতকারীদের আস্থা পুনর্গঠন এবং পুরো ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা চলছে।
প্রকৃত আর্থিক চিত্র প্রকাশই এখন বড় পরীক্ষা
১১টি ব্যাংকের সম্পদের মান যাচাইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ব্যাংকের হিসাবপত্রে থাকা তথ্যের সঙ্গে বাস্তব আর্থিক অবস্থার কতটা মিল রয়েছে তা বেরিয়ে আসা। দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণকে পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন বা বিভিন্ন হিসাবপদ্ধতির মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেক ঋণের বিপরীতে যে সম্পদ বন্ধক রাখা হয়েছে, তার প্রকৃত মূল্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে স্বাধীন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পদের বড় অংশ যাচাই করা হলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার একটি তুলনামূলক নিরপেক্ষ চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
তবে শুধু অনিয়ম শনাক্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কোনো ব্যাংকের সম্পদের মান দুর্বল পাওয়া গেলে কীভাবে সেই ঘাটতি পূরণ করা হবে, কোন ঋণ পুনর্গঠন করা হবে, কোন ঋণ আদায়ের জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কোথায় নতুন মূলধন প্রয়োজন হবে—এসব বিষয়েও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিশেষ করে ভালো সম্ভাবনা থাকা ব্যবসা ও প্রকল্পের ঋণ যদি শুধু ব্যাংকের সামগ্রিক দুর্বলতার কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আবার দুর্বল ও অযোগ্য ঋণগ্রহীতাকে শুধু ব্যাংক বাঁচানোর নামে নতুন করে অর্থায়ন করাও ঝুঁকিপূর্ণ।
তাই সম্পদের মান যাচাইয়ের পর ব্যাংকভেদে আলাদা ব্যবস্থা নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যাংককে পুনর্গঠন করতে হবে, কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে, আবার কোনো ক্ষেত্রে একীভূতকরণই হয়তো সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে সমস্যাকে লুকিয়ে রাখার পরিবর্তে প্রকাশ্যে আনতে হবে। ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ এবং ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতির মতো বড় সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা ছাড়া কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।
জানুয়ারি ২০২৭ থেকে শুরু হতে যাওয়া ১১ ব্যাংকের সম্পদের মান যাচাই তাই শুধু আরেকটি নিরীক্ষা নয়; এটি ব্যাংক খাতের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও হতে পারে। তবে সেই পরীক্ষার ফলাফল কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে অনিয়ম ও দুর্বলতা শনাক্ত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত এবং কতটা কঠোরভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয় তার ওপর।

