সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে এবার আরও শক্ত অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কোনো ব্যাংক গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়লে সেখানে অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সচল রাখা, প্রকৃত আর্থিক অবস্থা যাচাই, ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা এবং প্রয়োজনে সংকট নিরসনের উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসকদের বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ৬ আগস্ট ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’-এর আওতায় অস্থায়ী প্রশাসন পরিচালনার জন্য নতুন বিধিমালা জারি করেছে। নতুন এই বিধিমালা মূলত এমন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য, যেগুলো তাৎক্ষণিক সংশোধনমূলক ব্যবস্থার আওতায় এসেছে অথবা সংকট নিরসনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
এই বিধিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সংকটে পড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা শুধু পর্যবেক্ষণ করার মধ্যে প্রশাসকদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রয়োজন হলে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম সচল রাখতে তারা সরাসরি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এমনকি পরিস্থিতি অনুযায়ী শীর্ষ ব্যবস্থাপনার ব্যক্তিদের পরিবর্তন এবং চেয়ারম্যান, পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বও সাময়িকভাবে পালন করতে পারবেন।
প্রশাসক নিয়োগে স্বার্থের সংঘাত ঠেকানোর ব্যবস্থা
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগ এক বা একাধিক যোগ্য ব্যক্তিকে প্রশাসক বা সহকারী প্রশাসক হিসেবে মনোনীত করবে। তাঁরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা হতে পারেন, আবার বাইরের কোনো পেশাজীবীকেও নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।
তবে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কোনো স্বার্থের সংঘাত থাকা চলবে না। তিনি নিজে বা তাঁর পরিবারের কোনো সদস্য ওই প্রতিষ্ঠানের ঋণগ্রহীতা, পাওনাদার, শেয়ারধারী বা অন্য কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হতে পারবেন না।
নিয়োগ পাওয়ার পরও যদি কোনো প্রশাসকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আর্থিক কিংবা অন্য কোনো স্বার্থ তৈরি হয়, তাহলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগকে জানাতে হবে।
এই বিধান মূলত প্রশাসকের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংকটে থাকা একটি ব্যাংকের সম্পদ, ঋণ, পরিচালনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় প্রশাসকের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক স্বার্থ থাকলে পুরো প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
প্রয়োজনে বদলানো যাবে শীর্ষ ব্যবস্থাপনা
অস্থায়ী প্রশাসককে শুধু হিসাব পরীক্ষা বা প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম যাতে বন্ধ না হয়ে যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও তাঁদের দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রশাসক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চালু রাখতে পারবেন। প্রয়োজনে শীর্ষ ব্যবস্থাপনার কর্মকর্তাদের পরিবর্তনও করা যাবে।
পরিস্থিতি গুরুতর হলে চেয়ারম্যান, পরিচালক কিংবা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বও প্রশাসক সাময়িকভাবে পালন করতে পারবেন। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনা যদি কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ব্যর্থ হয়, তখন প্রশাসক সরাসরি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
এ ধরনের ক্ষমতা দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো সংকটে থাকা ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দ্রুততা আনা এবং এমন কোনো ব্যবস্থাপনা কাঠামো সরিয়ে দেওয়া, যা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট আরও গভীর করতে পারে।
প্রকৃত আর্থিক অবস্থা বের করতে নিরীক্ষা
যেসব ব্যাংক তাৎক্ষণিক সংশোধনমূলক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা যাচাই করতে প্রশাসককে একজন স্বাধীন নিরীক্ষক নিয়োগ করতে হবে।
এই নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, দায়, ঋণের মান এবং আর্থিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র বের করার চেষ্টা করা হবে। নিরীক্ষা শেষে আর্থিক বিবরণী ও প্রতিবেদন প্রশাসককে দায়িত্ব পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে জমা দিতে হবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ প্রয়োজনে অন্য সময়সীমা নির্ধারণ করতে পারবে।
এরপর প্রতিবেদন জমা দেওয়ার এক মাসের মধ্যে প্রশাসককে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা সংরক্ষণ বা পুনরুদ্ধারের জন্য একটি পরিকল্পনাও দিতে হবে।
এখানে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সংকটে থাকা ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রকাশিত হিসাব ও প্রকৃত আর্থিক অবস্থার মধ্যে পার্থক্য থাকলে তা শনাক্ত করা ছাড়া কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়।
সংকট নিরসনের পথও দেখাবেন প্রশাসক
কোনো প্রতিষ্ঠান সরাসরি সংকট নিরসন বা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় গেলে প্রশাসকের দায়িত্ব আরও বিস্তৃত হবে।
নিয়োগের দুই মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও দায়ের তালিকা তৈরি করে জমা দিতে হবে। এরপর ওই তালিকা জমা দেওয়ার এক মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির সংকট মোকাবিলায় কোন পদ্ধতিটি সবচেয়ে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ করতে হবে।
অর্থাৎ প্রশাসকের কাজ শুধু সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা নয়। প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ কীভাবে নির্ধারণ করা যায়, সেটির একটি বাস্তবসম্মত পথও তৈরি করতে হবে।
পরিস্থিতি অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও দায় নতুন পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে। আবার সেতু ব্যাংক, অন্য কোনো গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান বা অবসায়ক সংস্থার কাছেও এসব সম্পদ ও দায় হস্তান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে।
আর্থিক অপরাধের তদন্তেও ক্ষমতা
সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের সংকট যদি শুধু ব্যবসায়িক ব্যর্থতার কারণে না হয়ে আর্থিক অনিয়ম বা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়, সেক্ষেত্রেও প্রশাসকদের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন বিধিমালায় সন্দেহজনক আর্থিক অপরাধের বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য ফরেনসিক নিরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কোনো পরিচালক বা কর্মকর্তা ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’-এর অধীনে অপরাধে জড়িত ছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রশাসককে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো চলমান আইনগত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে না। অর্থাৎ প্রশাসকের নেওয়া পদক্ষেপের পাশাপাশি বিদ্যমান অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থাও চলতে পারবে।
ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ঋণের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এই ক্ষমতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ শুধু দুর্বল ব্যাংককে আর্থিকভাবে টিকিয়ে রাখাই যথেষ্ট নয়; সংকট তৈরির পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনাও জরুরি।
সব সিদ্ধান্তের হিসাব রাখতে হবে
অস্থায়ী প্রশাসককে তাঁদের নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের গোপনীয় তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রতি তিন মাস অন্তর ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
অস্থায়ী প্রশাসনের পুরো কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর তিন মাসের মধ্যে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদনও দিতে হবে।
এই নিয়মের মাধ্যমে প্রশাসকের ক্ষমতার পাশাপাশি তাঁদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কারণ সংকটে থাকা কোনো ব্যাংকের ওপর ব্যাপক ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপ নথিবদ্ধ করা জরুরি।
খরচ দেবে সমস্যাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান
অস্থায়ী প্রশাসকের পারিশ্রমিক কত হবে, তা বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারণ করবে। তবে প্রশাসন পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব খরচ বহন করতে হবে যে প্রতিষ্ঠানটি প্রশাসনের আওতায় এসেছে, সেই প্রতিষ্ঠানকেই।
অবশ্য এসব ব্যয় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত শর্তের অধীন থাকবে।
এতে সংকটে থাকা ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও একই সঙ্গে প্রশাসনিক কার্যক্রমের খরচের দায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর না দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর রাখার নীতি অনুসরণ করা হয়েছে।
নিয়োগের তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক
অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নতুন বিধিমালায় নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রশাসক নিয়োগের পরবর্তী কর্মদিবসের মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংককে নিজের ওয়েবসাইট এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি বহুল প্রচারিত একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিকেও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে।
এর ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানে অস্থায়ী প্রশাসন চালু হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আমানতকারী, গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে দ্রুত জানানো সম্ভব হবে।
আগের বিধান বাতিল, পুরোনো কার্যক্রম বহাল
নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০২৫ সালের ব্যাংক রেজল্যুশন বিধিমালায় থাকা অস্থায়ী প্রশাসন-সংক্রান্ত বিধানগুলো বাতিল করা হয়েছে।
তবে আগের বিধানের আওতায় ইতিমধ্যে যেসব কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাতিল হবে না। নতুন বিধিমালার অধীনেই সেসব কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে বলে গণ্য হবে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যবস্থা। কারণ বিধিমালা পরিবর্তনের কারণে আগে নেওয়া সিদ্ধান্ত বা কার্যক্রম নিয়ে যেন নতুন করে আইনি জটিলতা তৈরি না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
ব্যাংক খাতে নতুন বার্তা
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, দুর্বল পরিচালনা ও আর্থিক অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু নতুন মূলধন জোগান বা সাময়িক তারল্য সহায়তা দিয়ে সমস্যার সমাধান করা কঠিন।
প্রয়োজনে ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন, প্রকৃত আর্থিক অবস্থা যাচাই, সম্পদ ও দায়ের সঠিক হিসাব, অনিয়মের তদন্ত এবং সংকট নিরসনের কার্যকর পথ নির্ধারণ—সবকিছু একই কাঠামোর মধ্যে আনতে চাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নতুন বিধিমালার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য এখানেই। অস্থায়ী প্রশাসককে শুধু তদারককারী হিসেবে না দেখে প্রয়োজনে সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানের কার্যকর নিয়ন্ত্রক হিসেবে ভূমিকা পালনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তবে ক্ষমতা যত বাড়বে, জবাবদিহির প্রয়োজনও তত বাড়বে। প্রশাসকদের সিদ্ধান্ত কতটা নিরপেক্ষ, কতটা দ্রুত এবং কতটা আমানতকারী ও সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে নেওয়া হচ্ছে—সেটিই শেষ পর্যন্ত এই ব্যবস্থার সফলতা নির্ধারণ করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন উদ্যোগ তাই শুধু সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক সামলানোর একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়; বরং দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে শনাক্ত, মূল্যায়ন, পুনর্গঠন এবং প্রয়োজনে সংকট থেকে বের করে আনা হবে, তার একটি আরও সুসংগঠিত কাঠামো তৈরির চেষ্টা। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বিধিমালার কঠোর প্রয়োগ, স্বচ্ছতা এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বাস্তব জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর।

