ব্যাংকের এটিএম বুথে গিয়ে কার্ড আটকে যাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা নেই—এমন গ্রাহক খুঁজে পাওয়া কঠিন। বিদ্যুৎ বিভ্রাট হোক বা যন্ত্রগত ত্রুটি, কার্ড মেশিনের ভেতরে আটকে যাওয়ার ঘটনা দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের এক পরিচিত সমস্যা। এবার সেই ভোগান্তি দূর করতে বাজারে এসেছে একেবারে নতুন ধরনের প্রযুক্তি, যেখানে কার্ড মেশিনের ভেতরে ঢোকানোরই প্রয়োজন পড়বে না।
বেসরকারি খাতের একটি ব্যাংক—সিটি ব্যাংক—দেশে প্রথমবারের মতো চালু করেছে স্পর্শনির্ভর বা এনএফসি (নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন) প্রযুক্তির এটিএম সেবা। এই প্রযুক্তিতে গ্রাহককে আর কার্ড স্লটে প্রবেশ করাতে হবে না; শুধু নির্ধারিত জায়গায় কার্ড ছোঁয়ালেই মেশিন গ্রাহককে শনাক্ত করে ফেলবে। এরপর পিন নম্বর দিলেই মুহূর্তেই সম্পন্ন হবে টাকা তোলা, জমা রাখাসহ যেকোনো ব্যাংকিং লেনদেন।
সাধারণ এটিএম ব্যবস্থায় কার্ড পুরোপুরি মেশিনের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে তারপর পিন দিতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় মাঝেমধ্যেই কার্ড আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, বিশেষ করে অন্য ব্যাংকের কার্ড দিয়ে লেনদেন করার সময়। নতুন এনএফসি প্রযুক্তিতে এই সমস্যার কোনো অস্তিত্বই নেই। কার্ডকে মেশিনের গায়ে নির্দিষ্ট স্থানে কেবল স্পর্শ করালেই ডিভাইসটি সংকেত গ্রহণ করে গ্রাহক শনাক্ত করে ফেলে। ফলে লেনদান সম্পন্ন হয় আগের চেয়ে অনেক কম সময়ে ও নিরাপদভাবে।
সিটি ব্যাংক ইতিমধ্যে এই আধুনিক প্রযুক্তির প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি এটিএম বুথ স্থাপন করেছে দেশজুড়ে। ব্যাংকটি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে নতুন বুথ বসানো কিংবা পুরোনো বুথ পরিবর্তনের সময় ধারাবাহিকভাবে এই এনএফসি প্রযুক্তিই ব্যবহার করা হবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সুবিধা শুধু সিটি ব্যাংকের নিজস্ব গ্রাহকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। দেশের যেকোনো ব্যাংকের গ্রাহকই এই সেবা ব্যবহার করতে পারবেন। এর পেছনে কাজ করছে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ বা এনপিএসবি নামের একটি আন্তঃব্যাংক লেনদেন ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে এক ব্যাংকের গ্রাহক অনায়াসে অন্য ব্যাংকের এটিএম ব্যবহার করতে পারেন। তবে এ ধরনের ক্রস-ব্যাংক লেনদেনে প্রতিবার অতিরিক্ত ১৫ টাকা চার্জ প্রযোজ্য হবে।
এই সুবিধা পেতে হলে গ্রাহকের কার্ডটি অবশ্যই এনএফসি সমর্থিত হতে হবে। ভালো খবর হলো, বর্তমানে দেশের প্রায় সব ব্যাংকই এখন এই ধরনের আধুনিক কার্ড ইস্যু করছে, ফলে অধিকাংশ গ্রাহকের হাতে থাকা কার্ড দিয়েই এই সুবিধা উপভোগ করা সম্ভব হবে।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, কার্ড মেশিনের ভেতরে না ঢোকানোর কারণে কার্ড আটকে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা একেবারেই থাকছে না। পাশাপাশি নিরাপত্তার দিক থেকেও এটি বেশ কার্যকর। প্রচলিত এটিএম বুথে অনেক সময় প্রতারকচক্র গোপনে ‘স্কিমিং ডিভাইস’ বসিয়ে কার্ডের চৌম্বকীয় ফিতা থেকে তথ্য চুরি করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু এনএফসি প্রযুক্তিতে কার্ড ও মেশিনের মধ্যে সরাসরি সংকেত আদান-প্রদান হওয়ায় তথ্য ক্লোন করা বা চুরি করার সুযোগ প্রায় থাকে না বললেই চলে।
এ ছাড়া বারবার কার্ড মেশিনে প্রবেশ করানো ও বের করার কারণে কার্ডের চৌম্বকীয় ফিতা এবং ইএমভি চিপ ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। স্পর্শনির্ভর ব্যবস্থায় এই সমস্যাও এড়ানো সম্ভব, ফলে কার্ডের স্থায়িত্ব বাড়বে। একই সঙ্গে কার্ড শনাক্তকরণ ও লেনদেন শেষে কার্ড বের হওয়ার জন্য যে বাড়তি সময় ব্যয় হতো, তা-ও কমে আসবে বলে জানিয়েছে ব্যাংকটি।
সিটি ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্রাহকদের হয়রানি কমাতে এবং লেনদেনকে আরও সহজ ও দ্রুততর করতেই এই আধুনিক প্রযুক্তি চালু করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্যমতে, কার্ড না ঢুকিয়েই গ্রাহকেরা এখন থেকে আরাম করে ও নিরাপদে তাদের প্রয়োজনীয় লেনদেন সেরে ফেলতে পারবেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশের ব্যাংকিং খাতে এই উদ্যোগ প্রযুক্তিগত অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। গ্রাহক-বান্ধব এই সেবা ভবিষ্যতে অন্যান্য ব্যাংকও চালু করলে সামগ্রিকভাবে এটিএম লেনদেনের অভিজ্ঞতা আরও সহজ ও নিরাপদ হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।

