দেশের ব্যাংকিং খাতে সংখ্যায় সীমিত হলেও প্রভাবে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। বর্তমানে দেশে কার্যরত ৯টি বিদেশি ব্যাংক মিলে পরিচালনা করছে মোট ৭০টি শাখা ও ৫টি উপশাখা। সংখ্যায় কম হলেও দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এখন সম্পন্ন হচ্ছে এই ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ঊনিশ শতাংশ এবং আমদানির প্রায় তেরো শতাংশ সম্পন্ন হচ্ছে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। এর মধ্যে বহুজাতিক দুটি বড় ব্যাংক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগ পরিচালনা করে থাকে। বাকি সাতটি বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে কয়েকটি ভারত, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ কোরিয়া ও পাকিস্তানভিত্তিক।
শাখা নেটওয়ার্ক ছোট হলেও আমানত সংগ্রহে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অবস্থান বেশ মজবুত। তবে গত এক বছরে তাদের আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল সামান্যই। ২০২৪ সালের শেষ দিকে এসব ব্যাংকের মোট আমানত ছিল প্রায় সাতাশি হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি, যা এক বছর পর সামান্য বেড়ে প্রায় একই পর্যায়ে থেকে যায়। তবে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের তুলনায় তাদের আমানতের অংশীদারত্ব কিছুটা কমেছে—চার দশমিক ছয় শতাংশ থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে চার দশমিক দুই শতাংশে।
আমানতের ধরনেও দেশি ও বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে বড় পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। দেশীয় ব্যাংকগুলোর আমানতের প্রায় অর্ধেকই উচ্চ সুদের স্থায়ী আমানত, যেখানে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে এই হার মাত্র ষোলো শতাংশ। বিপরীতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর প্রায় চল্লিশ শতাংশ আমানত আসে তুলনামূলক কম সুদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে, যেখানে দেশি ব্যাংকে এই হার প্রায় ঊনত্রিশ শতাংশ। এ ছাড়া বিদেশি মুদ্রায় রাখা আবাসিক আমানতের হারও বিদেশি ব্যাংকে অনেক বেশি—প্রায় সতেরো শতাংশ, যেখানে দেশি ব্যাংকে তা মাত্র দুই শতাংশের কাছাকাছি। মূলত করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকনির্ভর হওয়ায় তাদের আমানত সংগ্রহের খরচও তুলনামূলক কম থাকে।
আমানতের বিপরীত চিত্র দেখা গেছে ঋণ বিতরণে। ২০২৪ সালের শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় বাহান্ন হাজার কোটি টাকা, যা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় সাড়ে এগারো শতাংশ কমে চুয়াল্লিশ হাজার কোটি টাকার ঘরে নেমে এসেছে। ফলে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে তাদের ঋণের অংশও কমে গেছে।
আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে অবশ্য বিদেশি ব্যাংকগুলোর ভূমিকা দিন দিন বাড়ছে। ২০২৪ সালের শেষ ছয় মাসের তুলনায় ২০২৫ সালের একই সময়ে রপ্তানি বিল সংগ্রহের পরিমাণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় সাড়ে আঠারো শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে আমদানি বিল পরিশোধের পরিমাণও বেড়েছে, যা মোট আমদানির প্রায় সাড়ে তেরো শতাংশ। তবে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে তাদের ভূমিকা এখনো একেবারেই নগণ্য।
সামগ্রিকভাবে বিদেশি ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা সামান্য বেড়েছে, তবে বিদেশে মুনাফা পাঠানোর পরিমাণ বেড়েছে আরও বেশি হারে—প্রায় দ্বিগুণেরও কাছাকাছি। বিশ্লেষকদের মতে, আগে ডলার-সংকটের কারণে তুলনামূলক কম মুনাফা বিদেশে পাঠানো গেলেও পরবর্তী সময়ে জমে থাকা মুনাফাও ধীরে ধীরে পাঠানো হচ্ছে।
তবে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব স্পষ্ট বিদেশি ব্যাংকগুলোর মুনাফার হিসাবেও। প্রায় প্রতিটি বহুজাতিক ব্যাংকের নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় কমেছে। এক ব্যাংকের মুনাফা কমেছে সামান্য পরিমাণে, আবার আরেকটি বহুজাতিক ব্যাংকের মুনাফা কমেছে প্রায় তেইশ শতাংশের মতো। এশিয়ার আরেকটি ব্যাংকের মুনাফাও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে, আর একটি মার্কিন ব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যক্রমের মুনাফাও আগের তুলনায় কমে এসেছে। দক্ষিণ এশীয় একটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের মুনাফাও কমতির দিকে, আর ক্ষুদ্র পরিসরে কার্যক্রম চালানো একটি ব্যাংকের মুনাফাও সামান্য কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এই প্রবণতা বিশ্লেষণ করে বলেন, তুলনামূলক কম সুদ পাওয়া সত্ত্বেও মানুষ বিশ্বাসযোগ্যতা ও সেবার মান বিবেচনায় বিদেশি ব্যাংকের দিকে ঝুঁকছে। তাঁর মতে, বৈশ্বিক মানের সেবা দ্রুত গ্রহণ করার সক্ষমতার কারণে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষ এসব ব্যাংকের নিয়মিত গ্রাহক হয়ে উঠছেন। এর ফলে সংখ্যায় কম হলেও এসব ব্যাংক লাভজনক অবস্থানে থাকছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়নেও তারা ভূমিকা রাখছে, যা দেশীয় ব্যাংকিং খাতের জন্য শেখার মতো একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের ধারণা, আকারে ছোট হলেও মানের দিক থেকে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ভূমিকা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও আর্থিক খাতে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, যদিও চলমান অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব থেকে তারাও পুরোপুরি মুক্ত নয়।

