বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বিদেশি ব্যাংকের উপস্থিতি সংখ্যায় খুবই ছোট। দেশে মাত্র ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অথচ দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৯ শতাংশ এসব ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে আসছে। বিপরীতে, দেশের ব্যাংকিং খাতের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করেও দেশি ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই জায়গায় কেন তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে, সেই প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলো ৪১২ কোটি ডলারের রপ্তানি বিল সংগ্রহ করেছে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে আমদানি বিল পরিশোধে তাদের অংশ ছিল ১৩ দশমিক ১ শতাংশ। অথচ পুরো ব্যাংকিং খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানতের অংশ মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং ঋণের অংশ ২ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকিং ব্যবসার আকারে তারা ছোট হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাদের উপস্থিতি অনেক বড়। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৫ সালের শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ছিল ৫ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে পুরো ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩২ শতাংশের বেশি। একই সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার হারও ছিল অনেক বেশি।
এর একটি বড় কারণ তাদের ব্যবসার ধরন। বিদেশি ব্যাংকগুলো সাধারণত বড় শাখা নেটওয়ার্ক তৈরি করে বিপুলসংখ্যক সাধারণ গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহের ওপর নির্ভর করে না। তারা বেশি মনোযোগ দেয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, রপ্তানিকারক ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের দিকে। ফলে একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ঋণপত্র খোলা, রপ্তানি বিল সংগ্রহ, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অর্থায়ন এবং বিদেশে অর্থ পরিশোধের মতো সেবাগুলো একই ব্যবস্থার মধ্যে দেওয়া তাদের জন্য তুলনামূলক সহজ। বিশেষ করে এইচএসবিসি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের মতো ব্যাংকের বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শাখা ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক থাকায় বিদেশি ক্রেতা, সরবরাহকারী ও অন্যান্য ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধাও বেশি।
অন্যদিকে দেশি ব্যাংকগুলোর সমস্যা শুধু প্রযুক্তি বা সেবার মানে সীমাবদ্ধ নয়। এর গভীরে রয়েছে ঋণ ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের দুর্বলতা। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া, দুর্বল ঋণ যাচাই এবং ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার কারণে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনার বড় একটি অংশ নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণের বদলে পুরোনো ঋণ আদায়, লোকসানের বিপরীতে অর্থ সংরক্ষণ এবং তারল্য ব্যবস্থাপনার চাপ সামলাতে ব্যস্ত থাকে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক সেবা দেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
আমানতের ধরনেও বিদেশি ও দেশি ব্যাংকের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের প্রায় ৩৯ শতাংশ আসে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে, যেখানে দেশি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ২৯ শতাংশ। আবার বিদেশি ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রায় থাকা আমানতের অংশও তুলনামূলকভাবে বেশি। এর ফলে তারা কম খরচে তহবিল সংগ্রহের সুযোগ পায়। বিপরীতে দেশি ব্যাংকগুলোকে বেশি সুদ দিয়ে স্থায়ী আমানত সংগ্রহ করতে হলে তাদের অর্থ সংগ্রহের খরচ বেড়ে যায়। সেই বাড়তি খরচ ঋণের সুদ ও ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার ওপরও প্রভাব ফেলে।
তবে বিদেশি ব্যাংকগুলোকে পুরোপুরি সফলতার মডেল হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই। ২০২৫ সালে তাদের ঋণ বিতরণও ১১ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে এবং মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার ১২২ কোটি টাকা। অর্থাৎ বেশি ঋণ বিতরণ করেই তারা এগিয়ে আছে, বিষয়টি এমন নয়। বরং সীমিত পরিসরে তুলনামূলক কম ঝুঁকির ও বেশি মূল্য সংযোজনকারী ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়াই তাদের শক্তির জায়গা। দেশি ব্যাংকগুলোর জন্য তাই শিক্ষা হওয়া উচিত বিদেশি ব্যাংকের শাখা বা পণ্য অনুকরণ করা নয়; বরং ঋণ যাচাই, সুশাসন, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নত করা।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের আকার বড়, কিন্তু সেই আকার তখনই অর্থনীতির শক্তিতে পরিণত হবে, যখন দেশি ব্যাংকগুলো দেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় বিশ্বমানের সেবা দিতে পারবে। বিদেশি ব্যাংকগুলো যে জায়গাটি দখল করেছে, সেটি শুধু তাদের শক্তির প্রমাণ নয়; একই সঙ্গে এটি দেশি ব্যাংকগুলোর জন্য নিজেদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে পরিবর্তনের একটি বড় বার্তাও।

