বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বিদেশি ব্যাংকের উপস্থিতি সংখ্যায় খুবই কম। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তাদের ভূমিকা অনেক বড়। দেশি ব্যাংকগুলো খাতের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করেও কেন এই জায়গায় পিছিয়ে—প্রশ্নটি তাই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে বিদেশি ব্যাংকগুলো দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমপরিমাণ রপ্তানি বিল সংগ্রহ করেছে। অথচ মোট আমানত ও ঋণের বাজারে তাদের অংশ ছিল অনেক কম।
অর্থাৎ ব্যাংকিং ব্যবসার আকারে বিদেশি ব্যাংকগুলো ছোট হলেও রপ্তানি-আমদানির মতো আন্তর্জাতিক লেনদেনে তাদের প্রভাব অনেক বেশি। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ তাদের ব্যবসায়িক কাঠামো।
বিদেশি ব্যাংকগুলো সাধারণত সারা দেশে বিপুলসংখ্যক শাখা খুলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে ব্যবসা বাড়ানোর ওপর নির্ভর করে না। তাদের প্রধান গ্রাহক বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি, রপ্তানিকারক এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান। এসব গ্রাহকের প্রয়োজনও সাধারণ ব্যাংকিং সেবার চেয়ে আলাদা। একজন রপ্তানিকারকের শুধু ঋণ দরকার হয় না; তাকে ঋণপত্র খুলতে হয়, বিদেশি মুদ্রায় লেনদেন করতে হয়, রপ্তানি বিল সংগ্রহ করতে হয়, বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে অর্থ দেশে আনতে হয় এবং অনেক সময় বিদেশি সরবরাহকারীকেও অর্থ পরিশোধ করতে হয়। বিদেশি ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই পুরো ব্যবস্থাকে নিজেদের ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তুলেছে। ফলে একটি বড় প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি তার আন্তর্জাতিক লেনদেনের অনেকগুলো কাজ একই ব্যাংক থেকে করা সম্ভব হয়।
এর সঙ্গে রয়েছে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সুবিধা। বড় বিদেশি ব্যাংকগুলোর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শাখা ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের কোনো রপ্তানিকারক যখন বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে ব্যবসা করে, তখন ক্রেতার ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এসব ব্যাংক বাড়তি সুবিধা পায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আস্থার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি ক্রেতা ও সরবরাহকারীরা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারে। ফলে বিদেশি ব্যাংকগুলো শুধু অর্থের লেনদেনই করে না, আন্তর্জাতিক ব্যবসার দুই পক্ষের মধ্যে একটি আর্থিক সেতু হিসেবেও কাজ করে।
অন্যদিকে দেশি ব্যাংকগুলোর পিছিয়ে থাকার সমস্যা শুধু প্রযুক্তি বা সেবার মানে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের দুর্বলতা জড়িয়ে আছে। দুর্বল ঋণ যাচাই, প্রভাবশালী গ্রাহকদের ঋণ দেওয়ার অভিযোগ, ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা এবং খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার কারণে ব্যাংকগুলোকে বড় চাপ সামলাতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় খেলাপি ঋণের হার ছিল এর তুলনায় অনেক কম। খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংককে সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। একই সঙ্গে পুরোনো ঋণ আদায় ও আইনি প্রক্রিয়া সামলাতেও সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। ফলে নতুন ব্যবসা তৈরি, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ কিংবা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বিশেষায়িত সেবা উন্নত করার মতো কাজে মনোযোগ কমে যেতে পারে।
আমানত সংগ্রহের ধরনেও দুই ধরনের ব্যাংকের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বিদেশি ব্যাংকগুলো বড় করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের সঙ্গে কাজ করায় তাদের আমানতের একটি বড় অংশ ব্যবসায়িক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত থাকে। অন্যদিকে দেশি ব্যাংকগুলো সাধারণ গ্রাহক ও বিভিন্ন ধরনের আমানতকারীর ওপর বেশি নির্ভরশীল। আমানত ধরে রাখতে বেশি সুদ দিতে হলে ব্যাংকের তহবিল সংগ্রহের খরচও বেড়ে যায়। সেই খরচ ঋণের সুদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। রপ্তানিমুখী ব্যবসার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে উদ্যোক্তাদের শুধু পণ্যের মান ও দামের দিকে নয়, অর্থায়নের খরচের দিকেও নজর দিতে হয়।
তবে বিদেশি ব্যাংকগুলোকে সব দিক থেকে আদর্শ মডেল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের ঋণ বিতরণও কমেছে। তাদের শক্তির জায়গা মূলত বেশি ঋণ দেওয়া নয়; বরং তুলনামূলক ভালো গ্রাহক বাছাই, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট সেবায় মনোযোগ দেওয়া। তারা সীমিত পরিসরে এমন ব্যবসা বেছে নেয়, যেখানে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং ব্যাংকের সেবার মূল্য বেশি।
দেশি ব্যাংকগুলোর জন্য এখানেই বড় শিক্ষা রয়েছে। বিদেশি ব্যাংকের শাখা বা পণ্য অনুকরণ করার চেয়ে ঋণ যাচাই, সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসেবার মান উন্নত করা বেশি জরুরি। দেশের ব্যাংকগুলো এসব জায়গায় শক্তিশালী হতে পারলে রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায় তাদের অংশও বাড়বে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের আকার বড়। এখন সেই আকারকে আন্তর্জাতিক সক্ষমতায় পরিণত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

