বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখন এমন এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার কয়েক বছর আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল। ব্যাংকের শাখায় গিয়ে হিসাব খোলা, টাকা পাঠানো কিংবা বিল পরিশোধের পাশাপাশি এখন মোবাইল ফোনেই এসব কাজ করা যাচ্ছে। জাতীয় কিউআর, মোবাইল আর্থিক সেবা, আন্তঃব্যাংক অর্থ স্থানান্তর, ই-পরিচয় যাচাই এবং ডিজিটাল ঋণ, সব মিলিয়ে আর্থিক সেবার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের পেমেন্ট সিস্টেমস প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই বছরে দেশের বিভিন্ন পেমেন্ট ব্যবস্থায় মোট লেনদেনের সংখ্যা প্রায় ১০৮০ কোটি, যা আগের বছরের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যা ও মূল্য—দুটিই প্রায় ১৩ শতাংশ করে বেড়েছে। মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাবও ২৫ কোটির কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং প্রায় ২০ লাখ এজেন্ট এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
সংখ্যাগুলো নিঃসন্দেহে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু ডিজিটাল লেনদেন যত বাড়ছে, একটি প্রশ্ন তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—প্রযুক্তি কি শুধু মানুষের কাছে পৌঁছেছে, নাকি মানুষও প্রযুক্তিকে নিজের করে নিতে পেরেছে?
কারণ একটি অ্যাপ তৈরি করা এবং সেটিকে মানুষের জন্য সহজ করে তোলা এক বিষয় নয়। প্রযুক্তি তখনই সত্যিকার অর্থে ‘স্মার্ট’, যখন একজন শহুরে তরুণের পাশাপাশি একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, একজন প্রবীণ, একজন স্বল্পশিক্ষিত গ্রাহক কিংবা প্রথমবার ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবহারকারীও সেটি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরিচালনা করতে পারেন।
বাংলাদেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তার এখন আর শুধু শহরকেন্দ্রিক ঘটনা নয়। মোবাইল আর্থিক সেবা, এজেন্ট ব্যাংকিং ও কিউআরভিত্তিক অর্থ পরিশোধ গ্রাম ও শহরের মধ্যে আর্থিক লেনদেনের ব্যবধান কমানোর সুযোগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোবাইল আর্থিক সেবায় লেনদেনের বড় অংশ এখনো নগদ জমা, নগদ উত্তোলন এবং ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি অর্থ স্থানান্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। অর্থাৎ মানুষ ডিজিটাল ব্যবস্থা ব্যবহার করছে, কিন্তু ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার সম্ভাবনার পুরোটা এখনো ব্যবহার করছে না।
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি রয়েছে। একটি মোবাইল হিসাব থাকা মানেই ডিজিটালভাবে দক্ষ হওয়া নয়। একজন গ্রাহক হয়তো টাকা পাঠাতে পারেন, কিন্তু ঋণের শর্ত বুঝতে পারেন না; হিসাবের স্থিতি দেখতে পারেন, কিন্তু সন্দেহজনক বার্তা শনাক্ত করতে পারেন না; কিউআর স্ক্যান করতে পারেন, কিন্তু ভুল লেনদেন হলে কোথায় অভিযোগ করতে হবে তা জানেন না।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের বৈশ্বিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি প্রতিবেদনের বাংলাদেশ-সংক্রান্ত ২০২৪ সালের জরিপে দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্ক উত্তরদাতাদের ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ গত সাত দিনে ইন্টারনেট ব্যবহার করেছিলেন এবং ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ ডিজিটাল পেমেন্ট করেছিলেন। এর মানে এই নয় যে বাকি ৭১.৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করতে জানেন না বা কখনোই করেন না।
বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক উপাত্তে দেখা যায়, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার এখন প্রায় ৫৩ শতাংশ থেকে ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে। অন্যদিকে, চতুর্থ প্রজন্মের (৪জি) মোবাইল নেটওয়ার্ক দেশের প্রায় পুরো জনগোষ্ঠীর কাছেই পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ ইন্টারনেট সংযোগের অবকাঠামো দ্রুত বিস্তৃত হলেও এর পূর্ণ সুবিধা এখনো দেশের সব মানুষের কাছে পৌঁছায়নি।
এই বাস্তবতা দেখিয়ে দেয়, শুধু নেটওয়ার্ক বা প্রযুক্তিগত অবকাঠামো সম্প্রসারণ করলেই ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয় না। ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ বহনের সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় ডিজিটাল দক্ষতার অভাব, আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সচেতনতার ঘাটতি এবং অনেক ক্ষেত্রে সংযোগের মান ও গতির সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহারের বাইরে রয়েছেন।
ফলে বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবধান তৈরি হয়েছে—একদিকে দ্রুত বাড়ছে প্রযুক্তির অবকাঠামো, অন্যদিকে সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা সবার মধ্যে সমানভাবে তৈরি হচ্ছে না। এই ব্যবধানই দেশের ডিজিটাল বিভাজনের অন্যতম বড় চিত্র। প্রকৃত ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে তাই শুধু সবার কাছে নেটওয়ার্ক পৌঁছে দিলেই হবে না; ইন্টারনেটকে মানুষের নাগালের মধ্যে আনা, ব্যবহার শেখানো এবং নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবহারের সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যাংকের ভাষা কি সাধারণ মানুষের ভাষা? ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে অবহেলিত বিষয়গুলোর একটি হলো ভাষা।ব্যাংকিং প্রযুক্তিতে ‘বেনিফিশিয়ারি’, ‘ডিসবার্সমেন্ট’, ‘ভেরিফিকেশন’, ‘সেটেলমেন্ট’, ‘অথরাইজেশন’ কিংবা ‘কমপ্লায়েন্স’-এর মতো শব্দ স্বাভাবিক হলেও সাধারণ গ্রাহকের কাছে এগুলো সবসময় স্বচ্ছ নয়। এমনকি বাংলা অনুবাদ করলেও অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা থেকেই যায়। ‘অনুমোদন’, ‘নিষ্পত্তি’, ‘উপকারভোগী’ কিংবা ‘পরিশোধযোগ্য’—এসব শব্দ অভিধানগতভাবে সঠিক হলেও দৈনন্দিন কথাবার্তার ভাষা নয়।
একজন গ্রাহক জানতে চান—‘আমার টাকা গেছে কি না?’ ব্যাংকিং ব্যবস্থা হয়তো বলে—‘লেনদেন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।’ গ্রাহক জানতে চান—‘টাকা আসতে কতক্ষণ লাগবে?’ প্রযুক্তি হয়তো বলে—‘লেনদেন প্রক্রিয়াধীন।’ দুই বাক্যের অর্থ কাছাকাছি হলেও ব্যবহারকারীর কাছে প্রথম ধরনের ভাষা অনেক বেশি সরাসরি ও বোধগম্য। তাই ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ শুধু বাংলা ভাষা যোগ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন মানুষের বোঝার মতো বাংলা।
বাংলাদেশের ভাষিক বাস্তবতা আরও বৈচিত্র্যময়। চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, নোয়াখালী, রংপুর কিংবা অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের উচ্চারণ ও কথ্যরীতিতে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
ভয়েসভিত্তিক ব্যাংকিং যত বাড়বে, এই বৈচিত্র্য তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একজন ব্যবহারকারী যদি নিজের স্বাভাবিক উচ্চারণে বলেন, ‘আমার হিসাবে কয় টাকা আছে?’—তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা সেই কথার উদ্দেশ্য বুঝতে পারছে কি না, সেটিই হবে প্রযুক্তির আসল পরীক্ষা।
এখানে অবশ্য একটি বাস্তব সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সব আঞ্চলিক উপভাষার জন্য বিপুল পরিমাণ উচ্চারণ, শব্দভান্ডার ও কথোপকথনের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও নিরাপদভাবে ব্যবহার করা সহজ কাজ নয়। ব্যাংকিংয়ের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি আরও বেশি। তাই আঞ্চলিক ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ লেনদেনে ব্যবহারকারীকে স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করার সুযোগ রাখতে হবে। শুধু ‘আপনি যা বলেছেন, সেটিই ধরে নেওয়া হয়েছে’—এমন ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশের ডিজিটাল যোগাযোগে আরেকটি বাস্তবতা হলো বাংলিশ। অনেক মানুষ বাংলা হরফে না লিখে ইংরেজি অক্ষরে বাংলা লেখেন—‘taka ashse?’, ‘balance koto?’, ‘taka pathabo’ ইত্যাদি।
এটি প্রমিত বাংলা নয়, কিন্তু ব্যবহারকারীর বাস্তব যোগাযোগ-পদ্ধতি। ফলে ভবিষ্যতের ব্যাংকিং চ্যাটবট যদি শুধু শুদ্ধ বানান ও আনুষ্ঠানিক বাক্য বুঝতে পারে, তবে সেটি প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হলেও ব্যবহারকারীর বাস্তব ভাষাজগত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে।
এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলা, বাংলিশ, বানানভুল, কথ্যরীতি এবং সংক্ষিপ্ত বাক্য—সব মিলিয়ে ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য বোঝার মতো ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব। তবে ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তিকে পরীক্ষিত ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ব্যবহার করতে হবে, কারণ একটি ভুল বোঝাবুঝি সরাসরি আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশের ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে জাতীয় কিউআর ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবস্থায় প্রায় ১০ লাখ ব্যবসায়ী যুক্ত হয়েছিল। ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে এর পূর্ণ আন্তঃকার্যকারিতা চালু হয়, ফলে বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা ও পেমেন্ট সেবার ব্যবহারকারীরা একই কিউআর ব্যবস্থার মাধ্যমে লেনদেন করতে পারেন।
এটি শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্যও এর অর্থ রয়েছে। একজন দোকানদারকে আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠানের কিউআর ব্যবস্থার বদলে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে এখানেও ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। কিউআর কোড থাকলেই মানুষ সেটি ব্যবহার করবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। দোকানদারকে জানতে হবে টাকা এসেছে কি না, গ্রাহককে জানতে হবে সঠিক দোকানে টাকা যাচ্ছে কি না এবং উভয় পক্ষকেই প্রতারণা এড়ানোর পদ্ধতি জানতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ব্যবসায়িক লেনদেনে বাংলা কিউআর ব্যবহারের বিষয়ে আরও কঠোর বাস্তবায়ন ও তদারকির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নগদ কেন এখনো টিকে আছে? ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বিস্তার দেখে মনে হতে পারে নগদ অর্থ দ্রুত অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে। বাস্তবতা এত সরল নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্য বলছে, ডিজিটাল লেনদেন দ্রুত বাড়লেও নগদভিত্তিক লেনদেনের সংখ্যাও বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের বাংলাদেশ জরিপে যারা দোকানে কেনাকাটায় শুধু নগদ ব্যবহার করেন, তাঁদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ বলেছেন ব্যবসায়ীরা নগদ ছাড়া অন্য পদ্ধতি গ্রহণ করেন না; ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ বলেছেন তাঁরা নগদ ব্যবহারে অভ্যস্ত। অর্থাৎ নগদ ব্যবহারের পেছনে শুধু প্রযুক্তির অভাব নেই; অভ্যাস, ব্যবসায়ীর প্রস্তুতি এবং ব্যবহারকারীর আস্থাও কাজ করে। সুতরাং ‘ক্যাশলেস’ হওয়ার প্রতিযোগিতার বদলে লক্ষ্য হওয়া উচিত নিরাপদ ও সুবিধাজনক লেনদেনের সুযোগ বাড়ানো।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো আস্থা। একজন গ্রাহক যদি মনে করেন ভুল বোতামে চাপ দিলেই টাকা হারিয়ে যেতে পারে, তাহলে তিনি প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকবেন। অন্যদিকে, প্রতারকেরা মানুষের ভয়, অজ্ঞতা ও তাড়াহুড়াকে কাজে লাগায়। গোপন নম্বর, যাচাইকরণ কোড বা কার্ডের তথ্য চাওয়ার মাধ্যমে তারা প্রযুক্তির দুর্বলতার চেয়ে অনেক সময় মানুষের দুর্বলতাকে লক্ষ্য করে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো আরও হালনাগাদ করেছে। এর পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা, ক্লাউড ব্যবহার ও অংশীদার নেটওয়ার্ক নিয়েও নির্দেশিকা রয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তার সবচেয়ে শক্তিশালী স্তর শুধু সফটওয়্যারে নয়—গ্রাহকের সচেতনতাতেও। তাই ব্যাংকের বার্তা হওয়া উচিত আরও সরল: ‘কেউ চাইলে গোপন যাচাইকরণ কোড দেবেন না।’ এর বদলে দীর্ঘ ও আনুষ্ঠানিক সতর্কবার্তা অনেক ব্যবহারকারীর কাছে কম কার্যকর হতে পারে।
ডিজিটাল ঋণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন অধ্যায়। ডিজিটাল ব্যাংকিং এখন শুধু টাকা পাঠানো বা বিল পরিশোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও লেনদেনের ইতিহাস ব্যবহার করে জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ঋণ বা ‘ন্যানো-লোন’ দেওয়ার বিকাশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের ব্যবস্থা ব্যাংকিংয়ের বাইরে থাকা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠবে—ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হচ্ছে? কোন তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে? ভুল তথ্যের কারণে কেউ ঋণ না পেলে তার প্রতিকার কী? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত বেশি আর্থিক সিদ্ধান্তে যুক্ত হবে, তত বেশি প্রয়োজন হবে স্বচ্ছতা, ব্যাখ্যাযোগ্যতা এবং মানুষের কাছে অভিযোগ জানানোর সুযোগ।
তাহলে সমাধান কোথায়? স্মার্ট ব্যাংকিংকে সত্যিকার অর্থে মানুষের উপযোগী করতে কয়েকটি পরিবর্তন জরুরি। প্রথমত, সহজ ভাষা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ও সতর্কবার্তা এমনভাবে লিখতে হবে, যাতে উচ্চশিক্ষিত না হলেও ব্যবহারকারী বুঝতে পারেন। দ্বিতীয়ত, কণ্ঠনির্ভর সেবা বাড়াতে হবে। তবে শুধু প্রমিত বাংলা নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন উচ্চারণ বোঝার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, ভুল করার সুযোগ কমাতে হবে। টাকা পাঠানোর আগে প্রাপকের নাম, নম্বর ও পরিমাণ বড় করে দেখানো, সন্দেহজনক লেনদেনে সতর্কবার্তা দেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ লেনদেনে অতিরিক্ত নিশ্চিতকরণ রাখা যেতে পারে।
চতুর্থত, বাংলিশ ও কথ্য ভাষা বোঝার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। মানুষ যেভাবে বাস্তবে লেখে, প্রযুক্তিকে সেই বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। পঞ্চমত, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ ব্যবহারকারীদের জন্য আলাদা নকশা প্রয়োজন। বড় অক্ষর, কণ্ঠনির্দেশনা, স্পষ্ট বোতাম ও কম ধাপের ব্যবস্থা তাদের জন্য ডিজিটাল ব্যাংকিংকে অনেক সহজ করতে পারে। ষষ্ঠত, ডিজিটাল আর্থিক শিক্ষা শুধু বিজ্ঞাপননির্ভর হওয়া উচিত নয়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাঠপর্যায়ে হাতে-কলমে শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে—বিশেষ করে প্রবীণ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নারী ও ডিজিটাল ব্যবহারে অনভিজ্ঞ মানুষের জন্য।
সবশেষে, প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক সহায়তার দরজা খোলা রাখতে হবে। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা সব সমস্যা সমাধান করতে পারবে না। যখন গ্রাহক আটকে যাবেন, তখন দ্রুত একজন প্রশিক্ষিত মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ থাকতে হবে।
বাংলাদেশের আর্থিক লেনদেনে ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘পেমেন্ট সিস্টেমস রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়ে ১০৮ কোটিতে পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনে ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার আরও বিস্তৃত হওয়ার চিত্র পাওয়া যায়।
একই সময়ে বাংলা কিউআর (Bangla QR) ব্যবস্থার বিস্তারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সাল নাগাদ দেশজুড়ে প্রায় ৯ লাখ ৬৩ হাজার, অর্থাৎ প্রায় ১০ লাখ মার্চেন্ট বা ব্যবসায়ী এই সর্বজনীন কিউআর নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছেন। ফলে ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কিউআরভিত্তিক ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের সুযোগ আরও বিস্তৃত হয়েছে।
বাংলা কিউআর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ৪৬টি ব্যাংক, ৭টি মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান এবং ৪টি পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি)। এর ফলে বিভিন্ন আর্থিক সেবার ব্যবহারকারীদের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই অগ্রগতি বাংলাদেশের নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে আরও ডিজিটালভিত্তিক লেনদেন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। তবে ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য এসব সেবা সহজ, নিরাপদ ও বোধগম্য করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির আরেকটি মাপকাঠি আছে—মানুষ সেটিকে কতটা সহজে বুঝতে ও বিশ্বাস করতে পারছে।
স্মার্ট ব্যাংকিংয়ের লক্ষ্য যদি শুধু দ্রুত লেনদেন হয়, তবে প্রযুক্তির কাজ সেখানেই শেষ। কিন্তু লক্ষ্য যদি হয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, তবে প্রযুক্তিকে মানুষের ভাষা, অভ্যাস, ভয়, ভুল এবং প্রয়োজন—সবকিছুকে বিবেচনায় নিতে হবে।
একজন মানুষ ‘অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স’ শব্দটি না বুঝলেও যেন নিজের হিসাবের টাকা জানতে পারেন। ‘বেনিফিশিয়ারি’ শব্দটি না জানলেও যেন নিরাপদে টাকা পাঠাতে পারেন। ইংরেজি অক্ষরে বাংলা লিখলেও যেন সহায়তা পান। আঞ্চলিক উচ্চারণে কথা বললেও যেন কণ্ঠসেবা তাঁকে বুঝতে পারে। কারণ প্রযুক্তির সাফল্য মানুষের প্রযুক্তি বোঝার ওপর নির্ভর করবে—এমন ধারণা বদলানোর সময় এসেছে। বরং প্রযুক্তিকেই মানুষের কাছে আরও বোধগম্য হতে হবে। স্মার্ট ব্যাংকিংয়ের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন ব্যাংকিং প্রযুক্তি শুধু মানুষের হাতে পৌঁছাবে না—মানুষের ভাষাতেও কথা বলবে।

