দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা চারটি ফাইন্যান্স কোম্পানি বন্ধ অথবা অবসায়নের পথ সুগম করতে সেগুলোর দায়িত্বভার এখন প্রশাসকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। রোববার জারি করা এক অফিস আদেশে বাংলাদেশ ব্যাংক এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়।
যে চারটি প্রতিষ্ঠান এই তালিকায় রয়েছে, সেগুলো হলো আভিভা ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য একজন করে অস্থায়ী প্রশাসক এবং তাঁকে সহায়তা করার জন্য দুজন করে সহযোগী প্রশাসক নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ মোট বারোজন কর্মকর্তা এখন এই চার প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকবেন, আর তাঁরা সবাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই কর্মকর্তা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ আগেই এসব প্রতিষ্ঠানকে রেজোল্যুশন প্রক্রিয়ার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এবার নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশাসন, ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেওয়া হলো, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি তদারকিতে চলে আসে।
কোন প্রতিষ্ঠানে কে দায়িত্বে? আভিভা ফাইন্যান্সের অস্থায়ী প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন পরিচালক, যিনি বর্তমানে ব্যাংক সুপারভিশন বিভাগ-১১-এ কর্মরত আছেন। তাঁকে সহায়তা করবেন একই বিভাগের দুজন অতিরিক্ত পরিচালক।
এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের প্রশাসক করা হয়েছে ব্যাংক সুপারভিশন বিভাগ-২-এ কর্মরত এক পরিচালককে, আর তাঁর সঙ্গে সহযোগী প্রশাসক হিসেবে থাকবেন দুজন অতিরিক্ত পরিচালক।
ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ব্যাংক সুপারভিশন বিভাগ-১০-এর একজন পরিচালককে, যাঁর সঙ্গে কাজ করবেন দুজন অতিরিক্ত পরিচালক।
আর ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের প্রশাসক হয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমিতে কর্মরত একজন পরিচালক, তাঁকেও সহায়তা করবেন দুজন অতিরিক্ত পরিচালক।
এর আগেই বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছিল, মোট পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাতাশ হাজার আমানতকারীর প্রায় দুই হাজার সাতশ কোটি টাকা জমা আছে। এসব প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ করার আগে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে আমানতকারীদের অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যক্তি পর্যায়ের আমানতকারীরা সর্বোচ্চ দশ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন বলে পরিকল্পনা রয়েছে, আর এ বিষয়ে সরকারের সম্মতিও ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে।
পঞ্চম প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের নামও এই তালিকায় ছিল, তবে আদালতের প্রয়োজনীয় আদেশ এখনো না পাওয়ায় সেটি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি।
গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ছিল রীতিমতো উদ্বেগজনক, প্রায় তিরানব্বই থেকে একশ শতাংশের কাছাকাছি। এফএএস ফাইন্যান্সের ক্ষেত্রে এই হার ছিল প্রায় শতভাগের কাছাকাছি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের প্রায় নিরানব্বই শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের সাড়ে আটানব্বই শতাংশ, আভিভা ফাইন্যান্সের প্রায় চুরানব্বই শতাংশ এবং পিপলস লিজিংয়ের প্রায় পঁচানব্বই শতাংশ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ আদায়ের সক্ষমতা প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল, যার ফলে সেগুলোকে টিকিয়ে রাখার সুযোগ কার্যত ছিল না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের প্রশাসক নিয়োগ শুধু প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের একটি ধাপ নয়, বরং দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কিছুটা হলেও ফিরিয়ে আনার একটি প্রচেষ্টা। আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ সফল হলে তা ভবিষ্যতে অনুরূপ সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে।

