দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া এবং আর্থিকভাবে টিকে থাকার সক্ষমতা হারানো চারটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে প্রধান নির্বাহীদের নিয়োগও বাতিল করা হয়েছে, আর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে বসানো হয়েছে প্রশাসক। এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এসব প্রতিষ্ঠানে জমা রাখা আমানতকারীদের অর্থ কীভাবে, কত পরিমাণে এবং কবে ফেরত আসবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যক্তি আমানতকারীদের সর্বোচ্চ দশ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হবে। এই উদ্দেশ্যে সরকার পাঁচটি সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের জন্য প্রায় দুই হাজার সাতশ কোটি টাকা বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরপর প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ আদায়, সম্পদ বিক্রি এবং অন্যান্য পাওনা উদ্ধারের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ থেকে বাকি অংশ ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার অর্থ এই নয় যে আমানতকারীদের টাকা একেবারে হারিয়ে যাচ্ছে; বরং আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে সম্পদ ও দায়ের হিসাব কষে পর্যায়ক্রমে অর্থ ফেরানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
নতুন প্রণীত একটি আইনের আওতায় চারটি প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর বা টিকে থাকার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে একটি ফাইন্যান্স কোম্পানি, একটি লিজিং প্রতিষ্ঠান এবং আরও দুটি বিনিয়োগ ও ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান। প্রতিটির দায়িত্বে একজন করে অস্থায়ী প্রশাসক এবং দুজন করে সহযোগী প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, ফলে মোট বারোজন কর্মকর্তা এখন প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা দায়িত্বে থাকবেন। এর ফলে আগের ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ কার্যত শেষ হয়ে গেছে, আর এখন আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা, সম্পদ সুরক্ষা ও দায়-দেনার হিসাব নির্ধারণের ভার প্রশাসকদের ওপর।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি, ব্যাপক পরিমাণে শ্রেণিকৃত ঋণ, তারল্য সংকট এবং আয়ক্ষমতার ক্রমাগত অবনতি—এসব কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলো আর টিকে থাকার মতো অবস্থায় ছিল না। গত বছরের শেষ নাগাদ এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ছিল প্রায় নব্বই থেকে শতভাগের কাছাকাছি, যা রীতিমতো ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ না থাকায় সরাসরি অবসায়নের পরিবর্তে নতুন কাঠামোর মাধ্যমে সম্পদ ও দায় ব্যবস্থাপনা করে অর্থ ফেরানোর পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
প্রথম ধাপে ব্যক্তি আমানতকারীরা সর্বোচ্চ দশ লাখ টাকা পর্যন্ত পাবেন। যাঁর হিসাবে এর কম অর্থ আছে, তিনি পুরো টাকাই ফেরত পাবেন। আর যাঁর দশ লাখের বেশি জমা আছে, তিনি প্রথম দফায় দশ লাখ টাকা পাবেন, বাকি অংশ পরের ধাপে যাবে।
দ্বিতীয় ধাপে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সম্পদ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উৎস হবে বছরের পর বছর অনাদায়ী থেকে যাওয়া ঋণ আদায়। পাশাপাশি জমি, ভবন, বিনিয়োগসহ অন্যান্য সম্পদও মূল্যায়ন করে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তৃতীয় ধাপে এভাবে উদ্ধার হওয়া অর্থ আইনি অগ্রাধিকার অনুযায়ী পাওনাদারদের মধ্যে বণ্টন করা হবে, যেখানে ব্যক্তি আমানতকারীদের স্বার্থে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো—নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন। দশ লাখ টাকার বেশি জমা থাকা মানেই বাড়তি অর্থ হারিয়ে যাওয়া নয়, তবে তা দ্রুত ফেরত পাওয়ারও নিশ্চয়তা নেই। কারণ বাকি অর্থ ফেরতের পরিমাণ নির্ভর করবে ঋণ কতটা আদায় করা যায় এবং সম্পদ বিক্রি করে কত টাকা ওঠে, তার ওপর। ফলে বড় অঙ্কের আমানতকারীদের কিছুটা ধৈর্য ধরতে হতে পারে।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় তেরো হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ব্যক্তি পর্যায়ের আমানত প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ এসেছে অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। প্রতিষ্ঠানভেদে ব্যক্তি আমানতের পরিমাণে যথেষ্ট তারতম্য রয়েছে—কোথাও তা কয়েকশ কোটি, কোথাও আবার হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই হিসাব থেকে স্পষ্ট, প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট দায় বিশাল হলেও সাধারণ ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে সামলানোর মতো পর্যায়ে আছে, যে কারণে প্রথম ধাপেই তাঁদের সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
দুই লাখ বা আট লাখ টাকা জমা থাকা কারও ক্ষেত্রে প্রথম ধাপেই পুরো অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু পঁচিশ লাখ টাকা জমা থাকলে প্রথমে দশ লাখ পাওয়ার পর বাকি পনেরো লাখ টাকার জন্য অপেক্ষা করতে হবে সম্পদ ও ঋণ আদায়ের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে। এক কোটি টাকা জমা থাকা আমানতকারীর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য—প্রথমে দশ লাখ, বাকি নব্বই লাখ পরবর্তী প্রক্রিয়ার ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো ভয় না পেয়ে হিসাবের কাগজপত্র সংরক্ষণ করা—আমানতের সনদ, জমার রসিদ, হিসাব বিবরণী সবকিছু গুছিয়ে রাখা প্রয়োজন। নিজের পাওনার সঠিক হিসাব মিলিয়ে রাখা এবং প্রশাসক বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ। কোনো দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর প্রলোভনে পড়ে দ্রুত টাকা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে বিশ্বাস না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসমর্থিত তথ্যের ওপর নির্ভর না করে শুধু সরকারি ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
সাধারণত কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে আমানত বীমার আওতায় একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত পাওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু এবার সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে এই সীমা বাড়িয়ে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে, যা প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় অনেকটাই ব্যতিক্রম। এর মূল লক্ষ্য হলো দীর্ঘদিন আটকে থাকা ছোট ও মাঝারি আমানতকারীদের দ্রুত কিছুটা স্বস্তি দেওয়া এবং আর্থিক খাতে সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করা।
আরও একটি লিজিং প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের তালিকায় রাখা হলেও পরিচালনা পর্ষদ আদালতের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়ায় সেখানে প্রশাসক বসানোর আগে আইনি জটিলতা কাটাতে হবে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে আদালতের কাছে আবেদন করা হয়েছে, রায়ের পরই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ছাড়া আরও চারটি সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানকে পরিস্থিতি ঠিক করার জন্য নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উন্নতি না হলে সেগুলোও একই প্রক্রিয়ার আওতায় আসতে পারে।
দেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘদিনের ঋণখেলাপি সংস্কৃতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে আমানতকারীদের টাকা আটকে থাকার ঘটনা নতুন নয়। তবে নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে একযোগে চারটি প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করে প্রশাসক নিয়োগের এই উদ্যোগ পুরো ব্যবস্থারই এক বড় পরীক্ষা বলা যায়। এর সফলতা নির্ভর করবে মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর—আমানতকারীদের প্রথম ধাপের অর্থ কত দ্রুত পৌঁছায়, বছরের পর বছর অনাদায়ী ঋণ কতটা কার্যকরভাবে আদায় করা যায়, এবং প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কতটা স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
শুধু সরকারি তহবিল দিয়ে প্রথম ধাপের অর্থ ফেরত দেওয়াই যথেষ্ট নয়; বাকি অর্থ ফেরাতে হলে খেলাপি ঋণ আদায় ও সম্পদ উদ্ধারে কঠোর ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ ও স্পষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা গেলে আমানতকারীদের মধ্যে ভরসা অনেকটাই ফিরে আসতে পারে। সব মিলিয়ে বলা যায়, এই সিদ্ধান্ত আমানতকারীদের টাকা হারিয়ে যাওয়ার ঘোষণা নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ও আইনি প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে অর্থ ফেরানোর একটি নতুন সূচনা—তবে চূড়ান্ত ফল কতটা ইতিবাচক হবে, তা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের গতি ও স্বচ্ছতার ওপর।

