ব্যাংক থেকে নেওয়া বড় ঋণের অর্থ ঠিকমতো ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ে কড়াকড়ি আনছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রস্তাবিত নীতিমালায় ৫০০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে বাইরের নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থের ব্যবহার যাচাই বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নীতিমালাটি এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ঋণের অঙ্ক অনুসারে যাচাইয়ের ধরন আলাদা হবে। ১০০ কোটি টাকার কম ঋণে গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ ব্যবহারের বিবরণী বা ঘোষণা নিতে হবে। এরপর ঋণগ্রহীতার ঝুঁকি, হিসাব পরিচালনার ধরন ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে ব্যাংক প্রয়োজনমতো ঝুঁকিভিত্তিক যাচাই করবে।
১০০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি টাকার ঋণে অর্থের সদ্ব্যবহার যাচাই করবে ব্যাংকের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ। তবে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিভাগ থেকে কাউকে এই যাচাইয়ে রাখা যাবে না।
৫০০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণে ব্যাংকের নিজস্ব যাচাইয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দিয়েও অর্থের ব্যবহার যাচাই করাতে হবে। যে প্রতিষ্ঠান এই যাচাই করবে, তাকে একই ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার কাজে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।
মেয়াদি ও প্রকল্প ঋণে কড়াকড়ি আরও বেশি। যেকোনো অঙ্কের এ ধরনের ঋণ কিস্তিতে দেওয়া হলে পরের কিস্তি ছাড়ের আগে আগের কিস্তির অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হয়েছে কি না, তা ব্যাংককে যাচাই করতে হবে। বিতরণ করা মেয়াদি বা প্রকল্প ঋণের মোট পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি হলে পুরো ঋণ বিতরণ শেষে তালিকাভুক্ত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে সামগ্রিক যাচাই করাতে হবে।
এই নিরীক্ষায় দেখা হবে, ঋণের অর্থ অনুমোদিত ব্যবসা বা প্রকল্পে ব্যবহার হয়েছে কি না এবং অন্য খাতে সরানো হয়েছে কি না। আরও যাচাই হবে:
- ঋণের কোনো অংশ নগদে তুলে অনুমোদিত উদ্দেশ্যের বাইরে ব্যবহার করা হয়েছে কি না
- অন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ শোধে অর্থ গেছে কি না
- শেয়ারবাজার, স্থাবর সম্পত্তি বা অন্য অননুমোদিত খাতে বিনিয়োগ হয়েছে কি না
- ব্যক্তিগত বা অ-ব্যবসায়িক কাজে অর্থ ব্যবহার হয়েছে কি না
- স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের কাছে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অর্থ গেছে কি না
- বিদেশে অর্থ স্থানান্তর বা অনুমোদনহীন অন্য কাজে ব্যবহার হয়েছে কি না
ঋণের অর্থে কেনা সম্পদ, পণ্য, যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম বা যানবাহন বাস্তবে আছে কি না, তাও দেখতে হবে। প্রকল্প ঋণে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে। আমদানি অর্থায়নে আমদানির কাগজপত্র, ঋণপত্র (এলসি), বিল অব এন্ট্রি ও কাস্টমসের নথি পরীক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, বিল, ভাউচার, চালান ও ক্রয়সংক্রান্ত কাগজ পর্যালোচনার বিধান রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে ব্যাংক নিজে বা নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরেজমিন পরিদর্শন করতে পারবে। সরবরাহকারী বা ক্রেতার সঙ্গে লেনদেনের সত্যতাও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের ব্যাংক খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণের অন্যতম বড় কারণ বেনামি ও ভুয়া ঋণ। অভিযোগ আছে, বন্ধকি সম্পত্তির মূল্য কয়েক গুণ বেশি দেখিয়ে ঋণের অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে। এসব ঋণের বড় অংশ বিদেশে পাচার করে অনেক ঋণগ্রহীতা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। বিভিন্ন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব ঋণ পেতে ব্যাংকের পরিচালক, প্রধান কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে জালিয়াতি হয়েছে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি বছর ব্যাংক পরিদর্শন করলেও সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শাখা ও কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে অন্য শাখার অনেক অনিয়ম নজরের বাইরে থেকে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অডিট ফার্মগুলোও যথাযথ প্রশ্ন না তুলে ব্যাংকের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন করেছে। ঋণের অর্থের প্রকৃত ব্যবহার নিয়ে আলাদা নিরীক্ষা চালু হলে এই ঝুঁকি কমবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিতরণের পর তৃতীয় পক্ষের যাচাই থাকলে ঋণের অপব্যবহার কমবে এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও তৈরি হবে বলে তাঁদের ধারণা।
বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ওবায়দুল হক টিবিএসকে বলেন, ঋণ বিতরণের পর অর্থ কোন খাতে ও কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তা কার্যকরভাবে নজরদারি করা গেলে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা, দুই পক্ষেরই জবাবদিহি বাড়বে। তাঁর মতে, এতে ব্যবসার নামে ঋণ নিয়ে জমি কেনা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বা বিদেশে পাচারের প্রবণতা কমতে পারে। ফলে নতুন করে খেলাপি ঋণ তৈরির ঝুঁকিও কমবে।
এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. তৌহিদুল আলম খান প্রস্তাবিত কাঠামোকে সময়োপযোগী ও যথাযথ বলে মনে করেন। তাঁর ভাষ্য, শুধু কাগুজে নথির ভিত্তিতে ঋণ দেওয়া, প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে দেখানো, ধার করা ইক্যুইটি এবং তহবিল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কারণে অনেক বড় ঋণের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, নিরীক্ষা এড়াতে যাতে ঋণগ্রহীতারা ঋণ ভেঙে ছোট অঙ্কে ভাগ করতে না পারেন, সে জন্য শিল্পগোষ্ঠীর সামগ্রিক ঋণের (গ্রুপ এক্সপোজার) সুস্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করা জরুরি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় ঋণের নজরদারিও বাড়িয়েছে। মে মাসে প্রতিটি ব্যাংকের কাছে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বিতরণ ও পুনঃতফসিল করা ২০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণের তথ্য চাওয়া হয়। কোন খাতে ও কোন গ্রাহককে ঋণ দেওয়া হয়েছে, তাও জানতে চাওয়া হয়। যাচাই করা হয়, আগের জালিয়াতি বা অর্থ পাচারে জড়িত কেউ বেনামে ঋণ নিয়েছে কি না এবং পুনঃতফসিলে নিয়ম মানা হয়েছে কি না।
কর্মকর্তারা জানান, এতে বেশ কিছু অনিয়ম ধরা পড়েছে। একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে বেনামি ঋণ দেওয়ার ঘটনা মিলেছে। প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট ছাড়া বড় ঋণ পুনঃতফসিল এবং পর্যাপ্ত জামানত ছাড়া ঋণ দেওয়ার ঘটনাও পাওয়া গেছে। এসব কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সতর্ক করে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
পুনঃতফসিল সুবিধা শিথিল ও ডাউন পেমেন্টের শর্ত সহজ করার পরও ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ জুন শেষে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তিন মাসে নতুন করে বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে খেলাপি ঋণের অনুপাত মার্চ শেষের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে বেড়ে জুন শেষে ৩২ দশমিক ৭৯ শতাংশ হয়েছে। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া বেশির ভাগ ব্যাংক কাঙ্ক্ষিত মুনাফা করতে পারেনি। মোট ঋণের বিপরীতে প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণের কথা থাকলেও গত বছরের শেষে খাতটির মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে।
আন্তর্জাতিক চর্চাতেও ঋণের অর্থ ব্যবহারে তৃতীয় পক্ষের যাচাইয়ের ব্যবস্থা আছে, যদিও শর্ত দেশভেদে আলাদা। ভারতে বড় ঋণ বিতরণের পর চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি ফার্মের মাধ্যমে ইউটিলাইজেশন রিপোর্ট নিয়ে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ায় জমা দিতে হয়। ঋণদাতাদের শুধু বাইরের সনদের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করার কথাও বলেছে সংস্থাটি। অর্থ অন্যত্র সরানোর সন্দেহ হলে সেখানে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ফরেনসিক অডিটও করা যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইউরোপিয়ান ব্যাংকিং অথরিটির নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে ঋণ বিতরণের পর নির্দিষ্ট সময় পরপর গ্রাহকের আর্থিক বিবরণী ও বহিঃনিরীক্ষকের প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে হয়।

