ব্যবসার হঠাৎ প্রয়োজনে টাকার জোগাড়ে আর ব্যাংকের দরজায় দরজায় ঘুরতে হবে না ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের। কোনো কাগজপত্র বা জামানত ছাড়াই এখন মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমেই মিলছে ব্যবসায়িক ঋণ। দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় এমনই একটি ডিজিটাল ঋণ সুবিধা চালু করেছে একটি বেসরকারি ব্যাংক ও একটি মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, যৌথ উদ্যোগে।
নতুন এই ব্যবস্থায় মোবাইল আর্থিক সেবার অ্যাপ ব্যবহারকারী যোগ্য ব্যবসায়ীরা কোনো নথিপত্র জমা না দিয়েই সঙ্গে সঙ্গে ঋণ পাচ্ছেন। জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত এই ঋণ নেওয়া যাচ্ছে, যা ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর।
সাম্প্রতিক জাতীয় অর্থনৈতিক শুমারির তথ্য বলছে, দেশে প্রায় সোয়া এক কোটি অর্থনৈতিক ইউনিট আছে। এর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠানই কোনো ধরনের সরকারি নিবন্ধনের আওতায় নেই। নিবন্ধন না থাকার কারণে এসব ব্যবসায়ীর বেশির ভাগই বাধ্য হয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে থাকেন। যাঁদের নিবন্ধন আছে, তাঁদেরও অনেকে কাগজপত্রের জটিলতা আর দীর্ঘসূত্রতার কারণে ব্যাংকঋণ পেতে হিমশিম খান। এই বাস্তবতা থেকেই ছোট উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন–সংকট দূর করতে একটি ডিজিটাল সমাধান হিসেবে সামনে এসেছে এই মার্চেন্ট ঋণ কার্যক্রম।
এই ঋণ পাওয়ার পদ্ধতিও বেশ সহজ করে সাজানো হয়েছে। কোনো দৃশ্যমান সম্পত্তি বা জামানত দেখানোর প্রয়োজন নেই। বরং একজন ব্যবসায়ীর মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টে আগের লেনদেনের ইতিহাসই তাঁর ঋণযোগ্যতা যাচাইয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হচ্ছে। যোগ্য ব্যবসায়ীরা সরাসরি অ্যাপ থেকেই মাত্র কয়েকটি ক্লিকে আবেদন করতে পারছেন, ব্যাংকে গিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই। যাঁর অ্যাকাউন্টে গ্রাহক-পেমেন্ট গ্রহণের হার যত বেশি ও নিয়মিত, তাঁর ঋণপ্রাপ্তির সম্ভাবনাও তত বেশি বলে জানা গেছে। অর্থাৎ লেনদেনের ধারাবাহিকতাই এখানে মূল যোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে উঠেছে। এই অর্থ ব্যবসায়ীরা পণ্য কেনা, ব্যবসা সম্প্রসারণ, মৌসুমি চাহিদা মেটানো কিংবা অন্য যেকোনো প্রয়োজনীয় মূলধন হিসেবে ব্যবহার করতে পারছেন।
দীর্ঘদিন ব্যাংকিং খাতের নানা আনুষ্ঠানিকতা আর সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ার কারণে ঋণসুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এই সেবা যেন এক নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। সাতক্ষীরার একজন জুতা ব্যবসায়ী সম্প্রতি অ্যাপের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা ঋণ পেয়ে জানান, আগে হঠাৎ টাকার দরকার হলে পরিচিতজনদের কাছে হাত পাততে হতো, যা মোটেও স্বস্তিদায়ক ছিল না। অ্যাপের মাধ্যমে ঋণপ্রাপ্তির এই সুযোগ তাঁর ব্যবসাকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কারুপণ্যের একজন নারী উদ্যোক্তাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেন। নিয়মিত ডিজিটাল মাধ্যমে গ্রাহক-পেমেন্ট গ্রহণ করার কারণে তাঁর অ্যাকাউন্টে ভালো লেনদেন-ইতিহাস তৈরি হয়েছিল, যা তাঁর জন্য ঋণ পাওয়া সহজ করে দেয় বলে তিনি জানান।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের একজন শীর্ষ বাণিজ্যিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশজুড়ে তাঁদের প্রায় আট লাখ মার্চেন্টের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে। ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করেই তাঁদের ঋণযোগ্যতা যাচাই করা হয়। তাঁর ভাষ্যমতে, এখন স্থাবর সম্পদের চেয়ে লেনদেনের ধরন ও ধারাবাহিকতাই ঋণপ্রাপ্তির প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অনিবন্ধিত অর্থনৈতিক ইউনিটের কথা বিবেচনায় নিলে এ ধরনের জামানতবিহীন ডিজিটাল ঋণ সেবা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা লাখো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য এই ধরনের সহজ শর্তের ঋণ কেবল তাৎক্ষণিক আর্থিক সমস্যার সমাধানই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে তাঁদের ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক খাতের সঙ্গে যুক্ত করার একটি কার্যকর মাধ্যমও হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

