কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে গোটা বিশ্বে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটি হলো, এই প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ফলে কত মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে। তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। বরং এআই এসব দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে নতুন গতি দিতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটির একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআইয়ের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কিছু নির্দিষ্ট খাতে কর্মসংস্থান কমতে পারে ঠিকই, তবে একই সঙ্গে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে নতুন ধরনের কাজের সুযোগও তৈরি হতে পারে। যদিও এআই প্রযুক্তির মূল উন্নয়নে এসব দেশের প্রত্যক্ষ ভূমিকা এখনো সীমিত।
মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো এই বড় পরিবর্তনের জন্য কতটা প্রস্তুত। বিশ্বব্যাংকের একটি বার্ষিক উন্নয়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বিদ্যমান চাকরির প্রায় সাড়ে চার শতাংশ জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে সম্পূর্ণভাবে স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এই হার প্রায় সাড়ে চোদ্দ শতাংশ। এসব ধনী দেশের আরও প্রায় ষোলো শতাংশ চাকরিতে এআই মানুষের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে পারে।
তথ্যপ্রযুক্তি, আর্থিক ও ব্যবসায়িক সেবার মতো যেসব খাতে মূলত বুদ্ধিভিত্তিক কাজ বেশি হয়, সেসব খাতেই এআই দিয়ে কাজ স্বয়ংক্রিয় করার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই ধরনের খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা এমনিতেই কম হওয়ায়, তারা কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে বলা যায়, বাংলাদেশের মতো দেশে এআইয়ের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাপক হারে চাকরি হারানোর ঝুঁকি কম, বরং কাজের ধরন বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
তবে এই পরিবর্তনের প্রভাব সবার ওপর একইভাবে পড়বে না। বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে তরুণ ও মাঝারি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীরাই এই পরিবর্তনের প্রথম ধাক্কা সামলাতে বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জনপ্রিয় এআই চ্যাটবট বাজারে আসার পর সহজে স্বয়ংক্রিয় করা যায় এমন চাকরির চাহিদা বিশ্বজুড়েই কমেছে, তবে উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এর প্রভাব তুলনামূলক কম।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চীনে জেনারেটিভ এআই চালুর পর চাকরির বিজ্ঞাপন সংখ্যা কমতে দেখা গেছে। ভারতেও একই প্রযুক্তি চালুর পর যেসব দক্ষতাসম্পন্ন কাজ এআই দিয়ে সহজে করা সম্ভব, সেসব পদের চাকরির বিজ্ঞাপন কমেছে—অর্থাৎ উচ্চ দক্ষতানির্ভর সেবা খাতেই এর প্রভাব বেশি পড়ছে, এবং এখানেও তুলনামূলক তরুণ কর্মীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোতে অধিকাংশ মানুষই কাজ করেন অতি ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে—প্রায় নব্বই শতাংশ কর্মী এমন প্রতিষ্ঠানে যুক্ত, যেখানে কর্মীসংখ্যা দশজনের কম, এবং অর্ধেকের বেশি মানুষ নিজেই নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করেন। এসব ছোট ব্যবসার বড় অংশ কৃষি, খুচরা বিক্রয় এবং খাদ্য-আবাসন সেবার সঙ্গে যুক্ত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্যও এআই নতুন সুযোগ তৈরি করছে। তারা নিয়মিত যেসব মেসেজিং অ্যাপ, সাধারণ ব্যবসায়িক সফটওয়্যার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে, এআই সেগুলোকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে—তা-ও বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ ছাড়াই। বিভিন্ন দেশের অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ব্যবসায়িক কাজে এআই চ্যাটবট ব্যবহার শুরু করেছে, যদিও উন্নত দেশগুলোর তুলনায় এই হার এখনো কিছুটা কম। প্রতিবেদনে এ-ও বলা হয়েছে, উন্নত ইন্টারনেট অবকাঠামো না থাকলেও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে, তবে এআই কার্যকরভাবে ব্যবহারের জন্য কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একেবারে পিছিয়ে নেই। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে—এআইনির্ভর মেডিকেল ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ডায়াবেটিসজনিত চোখের জটিলতা শনাক্তকরণ পরীক্ষার সংখ্যা প্রতিদিন প্রায় চল্লিশ শতাংশ বেড়েছে। দেশে আগে থেকেই তৈরি হওয়া সরকারি ডিজিটাল সেবার ভিত্তিকে এখন এআই খাতেও কাজে লাগানো যাচ্ছে, এবং কৃষি, স্বাস্থ্য ও নাগরিকসেবায় ইতিমধ্যে এআই ব্যবহারের বেশ কিছু উদ্যোগ শুরু হয়েছে।
তবে সাফল্যের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। মোবাইল ফোনের তথ্য ব্যবহার করে দরিদ্র পরিবার শনাক্তকরণে একটি এআইভিত্তিক পদ্ধতি প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি, এমনকি প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায়ও এতে নির্ভুলতা কম পাওয়া গেছে। এই অভিজ্ঞতা থেকেই বিশ্বব্যাংক পরামর্শ দিয়েছে, বিদেশি প্রযুক্তি হুবহু আমদানি না করে বাংলাদেশের উচিত তা স্থানীয় বাস্তবতায় যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী খাপ খাইয়ে নেওয়া। পাশাপাশি জাতীয় এআই নীতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক ও বৈদেশিক মুদ্রাসংক্রান্ত জটিলতা কমানো এবং সামগ্রিক ডিজিটাল অবকাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকায় একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে একজন প্রবাসী অর্থনীতিবিদও একই সুরে মত দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, যেসব অর্থনীতিতে দক্ষতার ঘাটতি তুলনামূলক বেশি, তারাই বরং এআই থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি লাভবান হতে পারে, যার মাধ্যমে দক্ষতার ব্যবধান অনেকটাই কমে আসতে পারে। তবে তাঁর মতে, এর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে—বিভিন্ন দেশে এআই গ্রহণের খরচের মধ্যে যেন খুব বেশি ফারাক না থাকে। অর্থাৎ ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যে এআইয়ের সুফল পাওয়ার পার্থক্য শুধু দক্ষতার ঘাটতির কারণে নয়, প্রযুক্তি গ্রহণের ব্যয়ের পার্থক্যের কারণেও তৈরি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, এআইয়ের প্রকৃত সুফল পেতে হলে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, উন্নত ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং সহায়ক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
এদিকে এআই, অটোমেশন ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থার দ্রুত বিস্তারে বাংলাদেশের শ্রমবাজার একটি বড় ধরনের রূপান্তরের মুখোমুখি হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তাদের একটি সাম্প্রতিক নীতিপত্রে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় নীতিগত প্রস্তুতির অভাবে আগামী দিনে বিশেষত তৈরি পোশাক খাতের লাখো শ্রমিক কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অটোমেশনের কারণে এই খাতে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে বারো লাখ চাকরি ঝুঁকিতে থাকতে পারে, এবং ২০৪১ সালের মধ্যে নারী পোশাকশ্রমিকদের প্রায় ষাট শতাংশের কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই পরিবর্তনের সঙ্গে একই সময়ে যুক্ত হচ্ছে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার—এই সবকিছু একসঙ্গে দেশের শ্রমবাজারে চাপ তৈরি করছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে সামগ্রিক কর্মসংস্থান কিছুটা কমেছে, যার একটি বড় অংশ নারী কর্মী। উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান তুলনামূলকভাবে স্থবির রয়েছে, বিপরীতে সেবা খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্ত থাকলেও তাদের একটি বড় অংশই অনিরাপদ ও কম উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত।
দেশের শ্রম গবেষক ও উৎপাদন খাত-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, অটোমেশন বা উচ্চ প্রযুক্তি গ্রহণ এখন কার্যত অনিবার্য একটি প্রক্রিয়া, এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ কার্যত নেই। তাই প্রয়োজন এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়া। তবে বর্তমানে অটোমেশনের কারণে হঠাৎ করে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হারিয়ে যাবে, এমনটা মনে করছেন না উৎপাদন খাত-সংশ্লিষ্টরা।
শ্রম অধিকারবিষয়ক একটি গবেষণাধর্মী বেসরকারি সংস্থার একজন নির্বাহী পরিচালকের মতে, অটোমেশনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব। তাঁর মতে, সরকার, শিল্পমালিক, শ্রমিক সংগঠন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি, যদিও বাস্তবে এখনো এ ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, অটোমেশন পুরোপুরি বাস্তবায়নের আগেই কর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি, পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং কর্মহীন মানুষদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে যেহেতু এ ধরনের রূপান্তরের জন্য বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং একসঙ্গে এত অর্থ জোগাড় করা সহজ নয়, তাই সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে বেশ কিছুটা সময় লেগে যাবে।
সবশেষে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের মূল বার্তা হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআই নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিলেও, এর সুফল এমনিতেই এসে ধরা দেবে না। বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল অবকাঠামো, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি নিজস্ব অত্যাধুনিক প্রযুক্তি তৈরির পরিবর্তে বিদ্যমান প্রযুক্তিকে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী খাপ খাইয়ে নেওয়াই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।

