নগদ লেনদেনের প্রবণতা কমিয়ে ডিজিটাল পেমেন্টকে আরও জনপ্রিয় করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘বাংলা কিউআর’ কোড ব্যবহার করে এখন থেকে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি পর্যায়েও টাকা পাঠানো যাবে। এই সুবিধা বাস্তবায়নের জন্য আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে নিজেদের অ্যাপে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যুক্ত করতে ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠান এবং পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গত বৃহস্পতিবার জারি করা একটি চিঠিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব কিউআর কোড তৈরি এবং অন্যের পাঠানো কিউআর কোড স্ক্যান বা আপলোড করার সক্ষমতা তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চিঠি অনুযায়ী, আগামী ১ নভেম্বর থেকে এই সেবা পুরোপুরি চালু করতে প্রস্তুত থাকতে হবে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের একজন পরিচালক জানান, বাংলা কিউআরকে একটি একক ও সর্বজনীন কোডে রূপান্তরের জন্য সার্বিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে মার্চেন্ট পেমেন্টের চার্জ শূন্য করা হয়েছে, যা আগামী অক্টোবর থেকে কার্যকর হবে। তিনি জানান, বর্তমানে প্রতিদিন বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে, যা অক্টোবরের পর থেকে বহুগুণে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন মুখপাত্র জানান, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেন সুবিধা চালু হলে ভুল অ্যাকাউন্টে টাকা চলে যাওয়ার মতো ঝুঁকি অনেকটাই কমবে। তাঁর ভাষ্যে, একক কিউআর কোডের মাধ্যমে গ্রাহক যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে লেনদেন করতে পারবেন, ফলে বারবার নাম বা তথ্য এন্ট্রি করার ঝামেলাও থাকবে না। তিনি আরও জানান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এমনকি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর আদায়েও বাংলা কিউআর ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে।
বর্তমানে বাংলা কিউআর মূলত দোকান বা ব্যবসায়িক পরিশোধে ব্যবহৃত হয়, যেখানে গ্রাহক দোকানদারের কিউআর স্ক্যান করে মূল্য পরিশোধ করেন। নতুন ব্যবস্থায় একই প্রযুক্তি দিয়ে এখন দুইজন ব্যক্তি নিজেদের মধ্যেও লেনদেন করতে পারবেন। যেমন কেউ তার সন্তান বা পরিবারের সদস্যকে টাকা পাঠাতে চাইলে গ্রহীতা নিজের অ্যাপ থেকে একটি কিউআর তৈরি করে পাঠাতে পারবেন, আর প্রেরক সেই কোড স্ক্যান করেই নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা পাঠিয়ে দিতে পারবেন—ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর বা রাউটিং নম্বরের মতো জটিল তথ্য হাতে লিখে দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। এই লেনদেনে বিদ্যমান আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রচলিত চার্জই প্রযোজ্য হবে, নতুন কোনো বাড়তি মাশুল থাকবে না।
ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে বাংলা কিউআরভিত্তিক সব লেনদেনের আন্তঃব্যাংক চার্জ ইতিমধ্যে শূন্যে নামিয়ে এনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এই পদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে ১০০ কোটি টাকার একটি প্রণোদনা তহবিলও গঠন করা হয়েছে, প্রয়োজনে যার আকার আরও বাড়ানো হবে বলে গত ৮ আগস্ট চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত এক কর্মশালায় জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।
গভর্নরের ভাষ্যমতে, ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণের সবচেয়ে বড় বাধা হলো দেশে এখনো প্রায় ছয় কোটি মানুষের বাটন ফোন ব্যবহার। তাঁদের ডিজিটাল সেবার আওতায় আনতে স্বল্পমূল্যে অ্যান্ড্রয়েড ফোন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, বাটন ফোন ব্যবহারকারীরা সাধারণত তিন হাজার টাকার মধ্যে একটি ফোনের জন্য ব্যয় করতে আগ্রহী, অথচ নির্মাতাদের মতে আট হাজার টাকার নিচে অ্যান্ড্রয়েড ফোন সরবরাহ করা সম্ভব নয়। এই মূল্যের ব্যবধান পূরণে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে বলে জানান তিনি, এবং কিস্তিতে ফোন কেনার সুযোগ তৈরির বিষয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে বলে জানান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলা কিউআরে মোট লেনদেন হয়েছিল সোয়া সাত লাখের কিছু বেশি, যার মূল্য ছিল প্রায় ২১২ কোটি টাকা। জুলাইয়ে এসে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬২ লাখ ৫৫ হাজারে, লেনদেনের মূল্য বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৪৭৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে লেনদেনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে আট গুণ এবং মূল্য প্রায় সাত গুণ বেড়েছে।
মার্চেন্টের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। মে মাসে বাংলা কিউআর ব্যবহারকারী মার্চেন্ট ছিল প্রায় সাড়ে তেরো লাখ, যা জুলাইয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে চব্বিশ লাখে—অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে প্রায় ৭৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।
কর্মশালায় বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন প্রশিক্ষক জানান, দেশে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়—টাকা ছাপানো, বিতরণ, ব্যবহার শেষে নষ্ট নোট সংগ্রহ ও ধ্বংস করা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায়। তাঁর মতে, একটি দরিদ্র দেশ হিসেবে শুধু নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় এত বিপুল অর্থ ব্যয় করা একধরনের অপচয়, আর ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার ঘটাতে পারলে এই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

