দেশের মুদ্রাবাজারে গত কয়েক দিনে একটি লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা গেছে রেমিট্যান্সের বিপরীতে ডলারের দাম কমতে শুরু করেছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম কমেছে প্রায় এক টাকা, যা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ একটি পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দেশের একাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংক রেমিট্যান্স হাউস থেকে প্রতি ডলার কিনেছে ১২২ টাকা ৭০ পয়সা দরে। অথচ গত সপ্তাহেই একই লেনদেন হয়েছিল ১২৩ টাকা ৬০ থেকে ৭০ পয়সার মধ্যে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই দরপতন ঘটেছে বেশ কিছুটা।
বাংলাদেশ ব্যাংক এবং কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তাঁদের ভাষ্যমতে, শুধু রেমিট্যান্সেই নয়, আমদানি বিল বা ঋণপত্র নিষ্পত্তিতেও ডলারের দাম কমতির দিকে। ব্যাংকাররা ধারণা করছেন, আগামী সপ্তাহে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হতে পারে।
এই দরপতনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা পর্যাপ্ত ডলার মজুত। প্রতিটি ব্যাংকের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি চলে এসেছে তাদের নিট ওপেন পজিশন—সহজ ভাষায় বললে, ব্যাংকগুলোর কাছে এখন চাহিদার তুলনায় ডলার বেশি। ফলে বাড়তি দামে রেমিট্যান্স কিনতে তাদের আগ্রহ কমেছে। উল্টো কম দামে ঋণপত্র নিষ্পত্তির প্রস্তাব দিয়ে দ্রুত হাতের ডলার ছাড়তে চাইছে তারা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি ইতিবাচক দিক—চলতি মাসের প্রথম বারো দিনেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি গত মাসে সরকারি পর্যায়ের আমদানি বিল পরিশোধের চাপ যতটা বেশি ছিল, চলতি মাসে তা তুলনামূলক কম। এই দুই কারণ মিলিয়ে বাজারে ডলারের চাহিদা কিছুটা শিথিল হয়ে এসেছে।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, যদি আগামী সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার না কেনে, তাহলে দাম আরও নিচে নামতে পারে—এমনকি একলাফে ১২২ টাকা ২০ পয়সায় নেমে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডলারের দর ১২২ টাকা ২০ পয়সার নিচে নামতে দিতে চায় না বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ দাম খুব বেশি কমে গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—প্রবাসীরা তখন বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। এই আশঙ্কা থেকেই আগামী সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কেনার উদ্যোগ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত জুলাই মাসে সরকারি পেমেন্টের চাপ অনেক বেশি থাকায় ডলারের দাম উল্টো বেড়ে গিয়েছিল। সে সময় ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স হাউস থেকে ডলার কিনেছিল ১২৩ টাকা ৮৫ থেকে ৯০ পয়সা দরে। কিন্তু আগস্টে সেই চাপ কমে আসায় দামও এখন নিম্নমুখী।
রেমিট্যান্সের দাম কমার প্রভাব পড়েছে ঋণপত্র বা এলসি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও। বৃহস্পতিবার বেশ কয়েকটি শিল্প গ্রুপ প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ১০ পয়সা দরে এলসি নিষ্পত্তি করেছে। একটি শিল্পগোষ্ঠীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার থেকেই দিনের পর দিন ধীরে ধীরে কমছে এই দর—সকালের তুলনায় বিকেলে দাম আরেকটু কম থাকছে। মঙ্গলবার সকালে যেখানে দর ছিল ১২৩ টাকা ৭০ পয়সা, বিকেলে তা নেমে আসে ১২৩ টাকা ৫০ পয়সায়। বুধবার একই প্যাটার্নে সকালে ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বিকেলে নেমে আসে ১২৩ টাকা ২৫ পয়সায়। আর বৃহস্পতিবার সকালে ১২৩ টাকা ১০ পয়সা থেকে বিকেলে দাঁড়ায় ১২৩ টাকায়। এমনকি একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে জানানো হয়েছে, আগামী সোমবার এলসি নিষ্পত্তি হতে পারে ১২২ টাকা ৯০ থেকে ৯৫ পয়সার মধ্যে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রায় ৬ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলারের এলসি নিষ্পত্তি করেছে, আর নতুন এলসি খোলা হয়েছে ৬ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারের। তার আগের মাস জুনে নিষ্পত্তি হয়েছিল ৭ বিলিয়ন ডলার—অর্থাৎ গত দুই মাসে বাজারে ডলারের চাহিদা যথেষ্ট ছিল।
রেমিট্যান্স প্রবাহের দিক থেকে দেখা যায়, জুন ও জুলাই—এই দুই মাস টানা তিন বিলিয়ন ডলারের নিচে রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। অথচ তার আগের ছয় মাস, অর্থাৎ ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত প্রতি মাসেই তিন বিলিয়নের বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল, যার মধ্যে মার্চে সর্বোচ্চ প্রায় পৌনে চার বিলিয়ন ডলার এসেছিল।
বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারে। সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের ধারণা, বাজারে সরবরাহ বাড়া এবং চাহিদা কমার এই সমন্বয়েই আপাতত ডলারের দামে স্বস্তির হাওয়া বইছে—তবে তা কতদিন স্থায়ী হয়, সেটি নির্ভর করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

