দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও গতিশীল ও সহজ করতে গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমদানি অর্থায়নের ক্ষেত্রে একাধিক নতুন সুবিধা যুক্ত করে ব্যবসায়ীদের জন্য বাণিজ্য পরিচালনাকে আরও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে একটি সংকলিত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে, যেখানে আগের বিচ্ছিন্ন নির্দেশনাগুলো একত্র ও হালনাগাদ করা হয়েছে। গত বছরের আগস্টে জারি হওয়া পুরোনো প্রজ্ঞাপন এবং তারপর সময়ে সময়ে জারি হওয়া বিভিন্ন নির্দেশনা একীভূত করে তৈরি হয়েছে এই নতুন সংস্করণ, যা এখন থেকে এক বছরের জন্য কার্যকর থাকবে। তবে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনসংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের নিয়মকানুন আগের মতোই বহাল রাখা হয়েছে।
নতুন নীতিমালার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, আমদানি করতে এখন থেকে সবসময় ঋণপত্র বা এলসি খোলার প্রয়োজন হবে না। নির্দিষ্ট শর্ত মেনে ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির ভিত্তিতেই পণ্য আমদানি করা যাবে। এছাড়া ডকুমেন্টারি কালেকশন পদ্ধতিতেও আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে, যেখানে অর্থ পরিশোধ বা গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে নথিপত্র হস্তান্তর করা যাবে। বাণিজ্যিক আমদানিতে সর্বোচ্চ ৬০ দিন পর্যন্ত বিলম্বিত পরিশোধের সুযোগও দেওয়া হয়েছে, যা ব্যবসায়ীদের নগদ প্রবাহ ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি আনবে।
শিল্প মালিকদের জন্য সবচেয়ে বড় সুখবর এসেছে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে। এখন থেকে নিজস্ব ব্যবহারের কাঁচামাল আমদানিতে সর্বোচ্চ ২৭০ দিন পর্যন্ত বাকিতে পরিশোধের সুযোগ থাকছে—তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ব্যবসায়িক চক্র এর চেয়ে কম হলে সেই সংক্ষিপ্ত সময়সীমাই প্রযোজ্য হবে। একই সুবিধা পাবে কৃষি যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক সার আমদানিও। এছাড়া যন্ত্রাংশ, জাহাজভাঙা শিল্পের জাহাজ এবং গবেষণাগার সামগ্রীর মতো কিছু পণ্যে সর্বোচ্চ ৩৬০ দিন এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামে ১৮০ দিন পর্যন্ত বাকিতে আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে।
মূলধনি যন্ত্রপাতি ও ভারী সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে আরও বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে—সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত বিলম্বিত পরিশোধের সুযোগ। রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, বেসরকারি রফতানি অঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কের মতো বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলোও এই সুবিধার আওতায় আসবে। ফলে বড় বিনিয়োগ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে বিপুল অর্থ পরিশোধের চাপ নিতে হবে না, যা তাদের কার্যকরী মূলধন ব্যবস্থাপনাকে সহজ করবে।
আমদানির আগে অগ্রিম অর্থ পাঠানোর নিয়মেও কিছুটা শিথিলতা আনা হয়েছে। গ্রহণযোগ্য ব্যাংক গ্যারান্টি থাকলে নির্দিষ্ট শর্তে আগাম অর্থ পরিশোধ করা যাবে। ২০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত অগ্রিম পরিশোধের ক্ষেত্রে আলাদা কোনো রিপেমেন্ট গ্যারান্টির প্রয়োজন হবে না। জরুরি পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি অর্থ আগাম পাঠাতে চাইলে সেজন্যও আবেদনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
আমদানি অর্থায়নের বিকল্প উৎস বাড়াতে সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ক্রেতা ঋণ, সরবরাহকারী অর্থায়ন এবং প্রদেয় হিসাব অর্থায়নের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করে আমদানিকারকরা বিকল্প উপায়ে অর্থায়নের সুযোগ পাবেন। এতে দেশীয় আমদানিকারকদের পাশাপাশি বিদেশি সরবরাহকারীরাও দ্রুত তাদের পাওনা বুঝে পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের জন্য পৃথক আমদানি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যেখানে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অনুমোদিত ব্যবসায়ী ও সরবরাহ সেবাদাতারাও আমদানি করতে পারবে। চালানভিত্তিক আমদানি করা পণ্য নির্দিষ্ট শর্তে চার থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত মজুত রাখার সুযোগও দেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্যের কাগজপত্র ডিজিটাল মাধ্যমে গ্রহণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে নতুন নীতিমালায়। নির্দিষ্ট শর্ত মেনে চালানপত্র, পরিবহন সংক্রান্ত নথি ও অন্যান্য বাণিজ্যিক দলিল এখন ইলেকট্রনিক মাধ্যমেও গ্রহণযোগ্য হবে। অনুমোদিত বাণিজ্য করিডোরে ডিজিটাল নথির পরীক্ষামূলক ব্যবহারও শুরু করার সুযোগ রাখা হয়েছে, যার আওতায় আসবে ইলেকট্রনিক পরিবহন নথি, বাণিজ্যিক চালানপত্র ও বিনিময় বিল।
সবমিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, এই সংস্কার আমদানিনির্ভর শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় স্বস্তি বয়ে আনতে পারে। একদিকে যেমন এলসি-নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে বাকিতে পণ্য আনার সুযোগ বাড়ায় ব্যবসায়িক তারল্য ব্যবস্থাপনাও অনেকটা সহজ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

