দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেডকে ঋণপত্র বা এলসি খোলার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী সুযোগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ঋণখেলাপি হওয়া সত্ত্বেও শতভাগ নগদ জামানতের বিনিময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এখন আমদানি ঋণপত্র খুলতে পারবে।
রোববার রাতে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের কাছে এ–সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশনা অনুযায়ী, এই সুবিধা কার্যকর থাকবে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১২১ নম্বর ধারার আওতায় সরকারের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে প্রজ্ঞাপনে।
সাধারণত ব্যাংকিং নিয়মে খেলাপি ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন কোনো ঋণসুবিধা বা এলসি খোলার সুযোগ থাকে না। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও জাতীয় গ্রিডে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা বিবেচনায় নিয়েই এই ব্যতিক্রম অনুমোদন করা হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, কেন্দ্রটি বর্তমানে সচল আছে এবং নিয়মিত জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। কাঁচামাল আমদানিতে বাধা তৈরি হলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই এই সিদ্ধান্ত। এর আগেও উৎপাদন ও কর্মসংস্থান রক্ষার যুক্তিতে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে একই ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
আলোচিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গড়ে উঠেছে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার গণ্ডামারা এলাকায়। এস আলম গ্রুপ এবং চীনের দুটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত এই কেন্দ্রের মোট উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট, যা দুটি পৃথক ইউনিটে বিভক্ত—প্রতিটির সক্ষমতা ৬৬০ মেগাওয়াট করে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে কেন্দ্রটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যায় এবং তখন থেকেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আসছে।
মালিকানার হিসাবে এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেডের ৭০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে এস আলম গ্রুপের হাতে। বাকি ৩০ শতাংশ শেয়ারের মালিক চীনের দুটি প্রতিষ্ঠান—সেপকো থ্রি এবং এইচটিজি ডেভেলপমেন্ট গ্রুপ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে এবং বেনামে নেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যার একটি বড় অংশই বর্তমানে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। এমন প্রেক্ষাপটে গ্রুপটির একটি প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে আমদানি সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাতে আলোচনার জন্ম দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্তের পেছনে স্বল্পমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার যুক্তি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলার জন্য একটি জটিল প্রশ্ন তৈরি করে। খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে বারবার ব্যতিক্রমী সুবিধা দেওয়ার নজির ভবিষ্যতে অন্য ঋণখেলাপিদের জন্যও একই ধরনের দাবি তোলার পথ খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রীয় জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষার নামে খেলাপি ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া কতটা শিথিল হয়ে পড়ছে, তা নিয়েও।

