দেশের কৃষি খাতে অর্থপ্রবাহ বাড়াতে ব্যাপক পরিসরে নতুন লক্ষ্যমাত্রা ও নীতিমালা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই খাতে মোট ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দেড় গুণ বেশি। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর জন্য একটি বাধ্যতামূলক শর্তও কঠোর করা হয়েছে—এখন থেকে প্রতিটি ব্যাংককে তাদের মোট বিতরণকৃত ঋণের অন্তত ৪ শতাংশ কৃষি খাতে দিতে হবে, যা আগে ছিল মাত্র আড়াই শতাংশ।
আজ সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সংবাদ সম্মেলনে এই নতুন কৃষি ও পল্লিঋণ নীতিমালা প্রকাশ করেন প্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান।
নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোকে দেওয়া হয়েছে প্রায় সাড়ে বিশ হাজার কোটি টাকার দায়িত্ব, আর বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর ভাগে পড়েছে প্রায় সাড়ে ঊনচল্লিশ হাজার কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, কৃষিতে অর্থায়ন বাড়িয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই এই নীতিমালার মূল লক্ষ্য। ঋণ কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য একটি নতুন ওয়েবভিত্তিক তথ্যব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারও চালু করা হয়েছে।
নতুন নীতিমালায় ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বেশ কিছু সহায়ক পরিবর্তন আনা হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে এখন আর প্রচলিত স্থাবর সম্পত্তি জামানত হিসেবে দেখাতে হবে না—এর পরিবর্তে ব্যক্তিগত, সামাজিক বা দলগত জামানতেই ঋণ পাওয়া যাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, এতে বিশেষত নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণপ্রাপ্তি সহজতর হবে।
গ্রামীণ এলাকার আয়বর্ধক নানা কর্মকাণ্ডে দলগতভাবে ঋণ দেওয়ার সুযোগও সম্প্রসারিত করা হয়েছে, এবং এ ধরনের ঋণে দলের সদস্যসংখ্যার শর্তও কিছুটা শিথিল করা হয়েছে।
এ ছাড়া কৃষিঋণের আওতায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু অপ্রচলিত খাত—মাছ ও হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদনকারী হ্যাচারি, উট পালন, এবং কয়েকটি ভেষজ ও জৈব কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, যেমন ব্লুবেরি চাষ, শিমুল মূল, অশ্বগন্ধা চাষ এবং ডিমের খোসা থেকে জৈব সার তৈরি।
ঋণগ্রহীতা কৃষক শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে। এখন স্থানীয় কৃষি, মৎস্য বা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার প্রত্যয়ন কিংবা সরকারি কৃষক কার্ডের মাধ্যমেই কৃষক শনাক্ত করা যাবে, এবং ঋণ নিতে পাসবই থাকার আগের বাধ্যবাধকতাও তুলে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংক ও গ্রাহকের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে কৃষকদের বিমার আওতায় আনারও সুযোগ রাখা হয়েছে নতুন নীতিমালায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, এই সামগ্রিক নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে কৃষি খাতে অর্থায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
তবে অর্থনীতি বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, লক্ষ্যমাত্রা ও জামানত-শর্ত শিথিল করাই যথেষ্ট নয়—নীতিমালার সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতার ওপর। অতীতে একাধিকবার দেখা গেছে, কৃষিঋণের একটি বড় অংশ প্রকৃত কৃষকের বদলে মধ্যস্বত্বভোগী বা অকৃষি খাতে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই নতুন সফটওয়্যারভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে কি না, তা নিয়েই এখন নজর রাখছেন সংশ্লিষ্টরা।

