দেশের দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ও সংকটে থাকা শিল্প-কারখানাগুলোকে আবার উৎপাদনে ফেরাতে সরকারের নেওয়া বড় ধরনের প্রণোদনা কর্মসূচি এবার বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ৩৮টি ব্যাংক ইতোমধ্যে চুক্তি করেছে। এসব ব্যাংক সম্মিলিতভাবে ২৮ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ চেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকেই এই কর্মসূচির আওতায় ঋণ বিতরণ শুরু হবে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং সংকট, জ্বালানি ঘাটতি ও অর্থের অভাবে বন্ধ বা দুর্বল হয়ে পড়া ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার চালু করার উদ্যোগ বাস্তব রূপ পেতে যাচ্ছে।
এই কর্মসূচি অবশ্য শুধু বন্ধ কারখানা চালুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে আরও বড় অর্থনৈতিক লক্ষ্য। বিনিয়োগ বাড়ানো, উৎপাদন ফিরিয়ে আনা, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সচল করা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি ফেরানোই এর মূল উদ্দেশ্য।
সুদের হার নিয়ে মতবিরোধের অবসান
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সুদের হার নিয়ে মতবিরোধ চলছিল। শেষ পর্যন্ত সেই জটিলতার সমাধান হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক তহবিল সরবরাহকারী ব্যাংকগুলোকে ৯ শতাংশ হারে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল। পরে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ব্যাংকগুলোকে দেওয়া হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদের হারের সঙ্গে আরও ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট যোগ করে।
গত ৩০ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদের হার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়েছে। প্রায় দুই বছর পর এটি ছিল প্রথম কমানো। এর ফলে বর্তমানে নীতি সুদের হার দাঁড়িয়েছে ৯.৫ শতাংশ। সেই হিসাবে পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের বর্তমান হার হচ্ছে ১০ শতাংশ।
এই পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ভবিষ্যতে নীতি সুদের হার পরিবর্তিত হলে তহবিলের সুদের হারও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বিত হবে। ফলে দীর্ঘ সময়ের জন্য একই সুদের হার ধরে রাখার প্রয়োজন হবে না।
একসঙ্গে নয়, ধাপে ধাপে যাবে অর্থ
৪১ হাজার কোটি টাকার পুরো অর্থ একবারে বাজারে ছেড়ে দেওয়া হবে না। আগামী তিন বছর ধরে প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে অর্থ দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, কোনো ব্যাংক যদি তার কোনো গ্রাহকের জন্য ১০০ কোটি টাকা চায়, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই চাহিদার সঙ্গে এমন একটি ব্যাংকের অর্থের যোগসূত্র তৈরি করবে, যার কাছে অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে এবং যে নির্ধারিত সময়ে অর্থ সরবরাহ করতে পারবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, এর ফলে ব্যাংকগুলোর অর্থ দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকার আশঙ্কা থাকবে না।
এর আগে সুদের হার নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. কবির আহমেদের সভাপতিত্বে একাধিক বৈঠক হয়েছিল। ব্যাংকগুলোর কোষাধ্যক্ষদের মধ্যে অগ্রিম আমানত অনুপাত নিয়েও মতপার্থক্য ছিল। এক পক্ষ ৬০-৭০ শতাংশ, অন্য পক্ষ ৭০-৮০ শতাংশ অনুপাতের কথা বলেছিল। তবে সেসব বৈঠকে শেষ পর্যন্ত ঐকমত্য হয়নি।
ব্যাংকগুলোর আরও কিছু উদ্বেগ
সুদের হার নিয়ে সমঝোতা হলেও ব্যাংকগুলোর উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। বিশেষ করে তারল্য সংকটের সময় এই তহবিলকে কীভাবে ব্যবহার করা যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই কর্মসূচির আওতায় থাকা অর্থ নগদ সংকটের সময় পুনঃক্রয় চুক্তির মাধ্যমে অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রে জামানত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
ব্যাংকারদের কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাধারণত ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুনঃক্রয় চুক্তির মাধ্যমে অর্থ নেয় এবং এর বিপরীতে সরকারি সিকিউরিটিজ জামানত রাখে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিপরীত পুনঃক্রয় ব্যবস্থার মাধ্যমে লেনদেন করে।
কিন্তু নতুন এই তহবিল সেই প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে পুরোপুরি পড়ছে না। ফলে ব্যাংকগুলো তাদের হিসাবের খাতায় এই অর্থ কীভাবে দেখাবে, সেটি নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
কেউ কেউ মনে করছেন, এটিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অর্থ জমা হিসেবে দেখানো যেতে পারে। আবার কেউ প্রশ্ন তুলছেন, এটি কি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে দেওয়া ঋণ হিসেবে হিসাব করা হবে?
এই হিসাবসংক্রান্ত বিষয়টির স্পষ্ট সমাধান না হলে ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলোর জন্য কিছু জটিলতা তৈরি হতে পারে।
৬০ হাজার কোটি টাকার বড় কর্মসূচি
এই উদ্যোগটি আসলে সরকারের ৬০ হাজার কোটি টাকার বৃহত্তর প্রণোদনা প্যাকেজের অংশ। গত মে মাসে এই প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল।
এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে অতিরিক্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলো থেকে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল হিসেবে।
এই ৪১ হাজার কোটি টাকার সবচেয়ে বড় অংশ, অর্থাৎ ২০ হাজার কোটি টাকা, বরাদ্দ রাখা হয়েছে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালুর জন্য। ব্যাংকিং সংকট, জ্বালানি ঘাটতি এবং মূলধনের অভাবে যেসব প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের এই অর্থের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া ৫ হাজার কোটি টাকা ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য রাখা হয়েছে। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য রয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। কৃষিভিত্তিক কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ ৩ হাজার কোটি টাকা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য আরও ৩ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, ছোট ব্যবসা, কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং নতুন রপ্তানি খাতকেও এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও ১৯ হাজার কোটি দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক
৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজের বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক সরবরাহ করবে। এই অর্থের পেছনে সরকারের নিশ্চয়তা থাকবে।
এই অংশ থেকে বিভিন্ন ধরনের ঋণ কর্মসূচিতে অর্থ দেওয়া হবে। রপ্তানির আগে অর্থায়নের জন্য পুনঃঅর্থায়ন, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে কুটির ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের ঋণ, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থানের ঋণ এবং কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে বেকারদের ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমেও ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এভাবে পুরো প্যাকেজটির লক্ষ্য শুধু শিল্প পুনরুদ্ধার নয়; বরং অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে অর্থের প্রবাহ বাড়ানো।
ঋণগ্রহীতাদের জন্য সুদ কত?
তহবিল সরবরাহকারী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থের বিপরীতে বর্তমানে ১০ শতাংশ হারে আয় করবে। কিন্তু কোনো ব্যাংক যখন তার গ্রাহকের জন্য এই তহবিল ব্যবহার করবে, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির কাছ থেকে মাত্র ৪ শতাংশ হারে অর্থ নেবে।
এরপর ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ নিতে পারবে।
অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়ন কাঠামোর মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের তুলনামূলক কম সুদে ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
কিছু নির্দিষ্ট খাতের জন্য সুদের হার আরও কম রাখা হয়েছে। যেমন নতুন উদ্যোগগুলো ৪ শতাংশের মতো কম সুদে অর্থ পেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকার বাজেট থেকে ভর্তুকি দিয়ে সুদের পার্থক্য পূরণ করবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
শুধু টাকা দিলেই কি শিল্প ঘুরে দাঁড়াবে?
এই প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বন্ধ কারখানা চালু করার জন্য সস্তা অর্থ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সব বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা যে শুধু অর্থের অভাব, তা নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের সংকটের পাশাপাশি জ্বালানি, বিদ্যুৎ, কাঁচামাল, বাজার, ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন ব্যয়ের সমস্যাও রয়েছে।
ফলে শুধু ঋণ দিয়ে একটি কারখানা আবার চালু করলেই সেটি টেকসইভাবে উৎপাদনে ফিরবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
তবে বর্তমান উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো, যেসব প্রতিষ্ঠান মূলত সাময়িক তারল্য সংকটে পড়ে বন্ধ হয়েছে বা উৎপাদন কমিয়েছে, তারা আবার কার্যক্রম শুরু করার সুযোগ পেতে পারে।
বিশেষ করে ব্যাংকিং সংকট ও জ্বালানি ঘাটতির কারণে যেসব প্রতিষ্ঠান কার্যকর উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পিছিয়ে পড়েছে, তাদের জন্য এই অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
২৫ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য
সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য এই কর্মসূচির আরেকটি বড় লক্ষ্য কর্মসংস্থান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় উৎপাদনে ফিরলে বেসরকারি খাতে প্রায় ২৫ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই সংখ্যাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি কারখানা বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু মালিক বা শ্রমিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে কাঁচামাল সরবরাহকারী, পরিবহন ব্যবসা, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবা খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একইভাবে একটি কারখানা আবার চালু হলে তার সুফলও পুরো সরবরাহব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অর্থনীতির জন্য এখন মূল পরীক্ষা বাস্তবায়ন
৩৮টি ব্যাংকের ২৮ হাজার কোটি টাকার বেশি চাহিদা দেখাচ্ছে, ব্যাংকগুলোর মধ্যে এই কর্মসূচি নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু শুধু চাহিদা থাকলেই এর সাফল্য নিশ্চিত হবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে যোগ্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং ঋণ ফেরতের সক্ষমতা যাচাই। কোনো প্রতিষ্ঠানকে শুধু রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী পরিচয়ের কারণে অর্থ দেওয়া হলে পুরো কর্মসূচিই ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
আবার অতিরিক্ত কড়াকড়ির কারণে প্রকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থ না পেলেও উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
তাই এই কর্মসূচির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সঠিক ভারসাম্য তৈরি করা—একদিকে অর্থ দ্রুত পৌঁছে দেওয়া, অন্যদিকে অর্থের অপব্যবহার ঠেকানো।
১ সেপ্টেম্বর থেকে ঋণ বিতরণ শুরু হওয়ার কথা। এখন দেখার বিষয়, ৬০ হাজার কোটি টাকার এই উদ্যোগ কাগজে থাকা একটি বড় পরিকল্পনা হয়ে থাকে, নাকি সত্যিই বন্ধ কারখানার চাকা ঘোরায়, বিনিয়োগ বাড়ায় এবং ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করে।
শেষ পর্যন্ত এই কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে কত টাকা বিতরণ হলো তার ওপর নয়; বরং কতগুলো বন্ধ প্রতিষ্ঠান সত্যিকার অর্থে উৎপাদনে ফিরল, কত নতুন বিনিয়োগ হলো এবং অর্থনীতিতে কতটা স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হলো—সেটিই হবে আসল মাপকাঠি।

