সোনালী ব্যাংকের আমানত বাড়লেও সেই তুলনায় ঋণ বিতরণ কম হওয়ায় ব্যাংকটির অ্যাডভান্স-ডিপোজিট রেশিও বা এডি অনুপাত নিচে নেমে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সবচেয়ে বড় এই ব্যাংককে অলস অর্থ বসিয়ে না রেখে উৎপাদনশীল খাতে মানসম্মত ঋণ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ কমানো এবং ঋণের অর্থ যেন আবার নতুন করে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে পরিণত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
রোববার সচিবালয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আর্থিক ও পরিচালন পরিস্থিতি, সাম্প্রতিক অগ্রগতি, সমস্যা এবং ব্যাংক খাতের সংস্কার নিয়ে ধারাবাহিক পর্যালোচনার অংশ হিসেবেই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক সভাপতিত্ব করেন।
সোনালী ব্যাংকের এডি অনুপাত কমে যাওয়াটিই সরকারের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এডি অনুপাত ছিল প্রায় ৫৮ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের ৬০ দশমিক ১১ শতাংশের চেয়ে কম। ২০২৩ সালে এটি ছিল ৬৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৫৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ। বছরের শেষ নাগাদ ব্যাংকটির আমানত প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকায় উঠলেও ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা।
সহজ করে বললে, ব্যাংকের হাতে আমানতকারীদের কাছ থেকে আসা বিপুল অর্থ থাকলেও তার তুলনামূলক কম অংশ ঋণ হিসেবে ব্যবসা ও উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি একদিকে ব্যাংকের তারল্য অবস্থানকে শক্তিশালী রাখে, কিন্তু অন্যদিকে ব্যাংকের মূল ব্যবসা ঋণ দিয়ে আয় করা কতটা কার্যকরভাবে হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তৈরি করে। বিশেষ করে সোনালী ব্যাংকের মতো বিশাল শাখা নেটওয়ার্ক ও বড় আমানতভিত্তির ব্যাংকের ক্ষেত্রে শুধু টাকা ধরে রাখাই সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না।
এর পেছনে অবশ্য একটি বাস্তব কারণও আছে। সোনালী ব্যাংক সরকারের ট্রেজারি ব্যাংক হিসেবে বড় সরকারি আমানত পরিচালনা করে এবং এর কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ও সেভিংস অ্যাকাউন্টভিত্তিক কম খরচের আমানত বা ক্যাসা ব্যাংকটির বড় সুবিধা। কিন্তু বৈঠকে মূলত প্রশ্ন উঠেছে, এই সুবিধা ব্যাংকের অর্থনীতিতে কতটা কার্যকর মূল্য তৈরি করছে। কম খরচে আমানত সংগ্রহ করে যদি সেই অর্থ নিরাপদ ও লাভজনক উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা না যায়, তাহলে বড় আমানতভিত্তি নিজেই কতটা অর্থবহ সেটিই এখন সামনে এসেছে।
এখানেই সরকারের নির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো শুধু ঋণ বিতরণ বাড়ালেই হবে না, ঋণের মানও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার এখনও প্রায় ১৬ শতাংশের ওপরে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ১৬ শতাংশের নিচে নামানোর কথা জানিয়েছিল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ; এর আগে ২০২৪ সালে তা ছিল ১৮ দশমিক ২০ শতাংশ।
অর্থাৎ এডি অনুপাত বাড়ানোর চাপ যদি এমনভাবে প্রয়োগ করা হয় যে ব্যাংক দ্রুত ঋণ দিতে গিয়ে দুর্বল গ্রাহক বা ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পে অর্থ দেয়, তাহলে সমস্যার সমাধান না হয়ে নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে। আজ যে ঋণ বিতরণ বাড়ছে, সেটিই কয়েক বছর পর খেলাপি ঋণে পরিণত হলে ব্যাংকের সম্পদমান আরও দুর্বল হবে। তাই বৈঠকে একদিকে উৎপাদনশীল খাতে ঋণ বাড়ানো, অন্যদিকে খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণ থেকে নগদ আদায় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সোনালী ব্যাংককে আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসের জন্য খেলাপি ঋণ কমানো, শ্রেণিকৃত ও অবলোপন করা ঋণ থেকে নগদ আদায় বাড়ানো এবং ভালো মানের নতুন ঋণ বিতরণের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ধীরে ধীরে এডি অনুপাতকে একটি যৌক্তিক পর্যায়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সরকারের বার্তাটি মূলত ‘যত বেশি ঋণ, তত ভালো’ নয়; বরং ভালো ঋণ বাড়াতে হবে, খারাপ ঋণ নয়।
বৈঠকে সোনালী ব্যাংকের সাম্প্রতিক মুনাফা বৃদ্ধিকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ৮ হাজার ১৭ কোটি টাকায় উঠেছিল, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ বেশি। একই সময়ে আমানত বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা এবং ঋণপোর্টফোলিও প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়।
তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব সামনে এসেছে এই মুনাফার কতটা এসেছে মূল ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকে এবং কতটা এসেছে সরকারি আমানত ও ট্রেজারি ব্যবসার মতো বিশেষ সুবিধা থেকে? বিশাল সম্পদ ও শাখা নেটওয়ার্ক পরিচালনার পর প্রকৃত রিটার্ন কত, যথাযথ প্রভিশন রাখার পর মুনাফা কতটা টেকসই, আর সরকারি ব্যবসার সুবিধা বাদ দিলে সোনালী ব্যাংক বেসরকারি ব্যাংকের সঙ্গে কতটা প্রতিযোগিতা করতে পারে এসব প্রশ্নই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারি ব্যবসা ব্যাংকটির ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সক্ষমতা নির্ভর করে গ্রাহকসেবা, ঋণ নির্বাচন, প্রযুক্তি, করপোরেট ব্যাংকিং ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ওপরও।
এ কারণে সোনালী ব্যাংককে শুধু ঋণ বাড়ানোর নয়, নিজস্ব বাণিজ্যিক সক্ষমতা শক্তিশালী করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কাস্টমার সার্ভিস, ডিজিটাল ব্যাংকিং, করপোরেট ও সিএমএসএমই অর্থায়ন, ট্রেড ফাইন্যান্স, রেমিট্যান্স, ট্রেজারি ব্যবস্থাপনা এবং নতুন আর্থিক পণ্যে জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। লক্ষ্যটা স্পষ্ট সরকারি আমানত ও ব্যবসার সুবিধা থাকবে, কিন্তু ব্যাংককে তার বাইরে নিজস্ব গ্রাহকভিত্তি ও আয় তৈরির সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
সবশেষে প্রশ্নটা তাই শুধু ‘সোনালী ব্যাংক কত টাকা ঋণ দেবে’ এখানে আটকে থাকছে না। আসল প্রশ্ন হলো, সেই ঋণ কোথায় যাবে এবং কতটা নিরাপদ থাকবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের হাতে যদি বিপুল আমানত থাকে, কিন্তু উৎপাদনশীল খাতে তার পর্যাপ্ত ব্যবহার না হয়, তাহলে অর্থনীতিতেও তার সুফল সীমিত থাকে। আবার শুধু এডি অনুপাত বাড়ানোর জন্য ঋণ বিতরণ করলে সেটি ভবিষ্যতের খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়াতে পারে। তাই সোনালী ব্যাংকের সামনে এখন একই সঙ্গে দুটি কাজ অলস অর্থকে অর্থনীতিতে কাজে লাগানো এবং সেই অর্থ যেন আবার নতুন খেলাপি ঋণে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করা।

