একটি দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা অনেকটা রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থার মতো। মানুষের সঞ্চয় ব্যাংকে জমা হয়, সেই অর্থ ঋণ হিসেবে শিল্প, ব্যবসা ও উৎপাদন খাতে প্রবাহিত হয়; বিনিয়োগ বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। কিন্তু এই পুরো ব্যবস্থার দৃশ্যমান ভিত্তি যতটা টাকা, অদৃশ্য ভিত্তি তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সেটি হলো গ্রাহকের আস্থা।
একজন মানুষ যখন তাঁর জীবনের সঞ্চয় ব্যাংকে রাখেন, তখন তিনি শুধু একটি হিসাব নম্বরে টাকা জমা দেন না; তিনি ধরে নেন, প্রয়োজনের সময় সেই অর্থ ফেরত পাবেন, ব্যাংক তাঁর স্বার্থ রক্ষা করবে এবং প্রতিষ্ঠানটি নিয়ম, দক্ষতা ও সুশাসনের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। ফলে ব্যাংকের প্রকৃত মূলধনের একটি অংশ হিসাবের খাতায় নয়, মানুষের বিশ্বাসে জমা থাকে। সেই বিশ্বাস দুর্বল হলে বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও একটি ব্যাংক সংকটে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন সেই আস্থার কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের দুর্বল সুশাসন, অনিয়মিত ঋণ বিতরণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং তদারকির সীমাবদ্ধতার কারণে খাতটির আর্থিক ভিত্তিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের মূল্যায়নে মার্চ শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২.৬ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূলধন অনুপাত ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশে নেমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় খেলাপি ঋণের অনুপাত যেখানে ৭.৯ শতাংশ, বাংলাদেশের পরিস্থিতি সেখানে বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।
তবে একই সঙ্গে আশার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে নানা সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও মানুষের ব্যাংকমুখী প্রবণতা পুরোপুরি থেমে যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা, যা মার্চের ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২৪ কোটি টাকা থেকে তিন মাসে ৫২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা বেশি।
এই প্রবৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—ব্যাংকিং খাত নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও মানুষ এখনো সঞ্চয়ের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে। অর্থাৎ আস্থার ভিত্তি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। তবে এই আস্থা কতটা গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
জুন প্রান্তিকে এক কোটি টাকা বা তার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যাও ৫ হাজার ৭৭টি বেড়ে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে এসব হিসাবকে সরাসরি ‘কোটিপতি মানুষের সংখ্যা’ হিসেবে দেখা যাবে না; কারণ এর মধ্যে ব্যক্তি ছাড়াও ব্যবসা, প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার হিসাব রয়েছে।
অতএব আমানত বাড়ছে—এটিকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা গেলেও এটিই ব্যাংকিং খাতের সুস্থতার একমাত্র প্রমাণ নয়। খেলাপি ঋণ, মূলধনের দুর্বলতা, তারল্য পরিস্থিতি, সুশাসন এবং আমানতকারীর অর্থ কতটা নিরাপদ—এসব সূচকও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের সঞ্চয় ব্যাংকে আছে; এখন সেই সঞ্চয়ের নিরাপত্তা ও আস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি দেওয়াই হবে ব্যাংকিং সংস্কারের বড় পরীক্ষা।
ব্যাংকের সঙ্গে গ্রাহকের সম্পর্ক মূলত একটি প্রতিশ্রুতির সম্পর্ক। ব্যাংক বলে—আপনার অর্থ আমরা নিরাপদে রাখব এবং প্রয়োজনের সময় তা ব্যবহারের সুযোগ দেব। বিনিময়ে ব্যাংক সেই অর্থের একটি অংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করে আয় করে। এই ব্যবস্থায় ঋণগ্রহীতার অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ব্যাংকের ঋণ যাচাই ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘ সময় ধরে এই ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে দুর্বলতা জমেছে। কোথাও ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই হয়নি, কোথাও অতিরিক্ত ঋণ দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও সংশ্লিষ্ট পক্ষের স্বার্থের সংঘাত যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। এর ফলে ব্যাংকের সম্পদের একটি অংশ ধীরে ধীরে ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন খেলাপি ঋণ। ২০২৬ সালের মার্চে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২.৬ শতাংশে পৌঁছানো কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি ব্যাংকের সম্পদের মান, মূলধন এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর সরাসরি চাপের প্রতিফলন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৭.৯ শতাংশ।
তবে বর্তমান অঙ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাও রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঋণ শ্রেণীকরণ ও সংস্থান ব্যবস্থায় কঠোরতা বাড়ানোর ফলে আগে যেসব সমস্যা হিসাবের আড়ালে ছিল, সেগুলোর একটি অংশ এখন স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে কঠোর ঋণ শ্রেণীকরণ নির্দেশনা এবং ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শ্রেণীকরণ ও সংস্থান বিধি কার্যকর হয়। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের বর্তমান অঙ্ক সংকটকে আরও দৃশ্যমান করেছে। এটি অস্বস্তিকর হলেও প্রকৃত পরিস্থিতি জানা সংস্কারের প্রথম শর্ত।
খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকের মুনাফা কমে, সংস্থান বাড়াতে হয়, মূলধনের ওপর চাপ পড়ে এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা সংকুচিত হয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর পড়ে। অন্যদিকে ব্যাংকে আমানত বাড়লেও ঋণের চাহিদা ও বিতরণ তুলনামূলকভাবে দুর্বল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪.৪৭ শতাংশে নেমে আসে। জুনে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা।
এই পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য জরুরি। ব্যাংককে এমনভাবে ঋণ দিতে হবে না, যাতে আবার অনিয়ন্ত্রিত খেলাপি ঋণ তৈরি হয়; আবার অতিরিক্ত ঝুঁকিভীতির কারণে উৎপাদনশীল ব্যবসা ও উদ্যোক্তারাও যেন অর্থ থেকে বঞ্চিত না হন। ভবিষ্যতের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তাই ঋণের পরিমাণের চেয়ে ঋণের গুণগত মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে হবে।
ব্যাংকের মূলধন হলো সম্ভাব্য ক্ষতির বিরুদ্ধে তার প্রথম নিরাপত্তা। কোনো ঋণ ফেরত না এলে বা কোনো সম্পদের মূল্য কমে গেলে ব্যাংকের মূলধন সেই ক্ষতি শোষণ করে। তাই খেলাপি ঋণ যত বাড়ে, মূলধনের ওপর চাপ তত বাড়ে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন অনুপাত ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশ হওয়া এই দুর্বলতারই বড় ইঙ্গিত।
এই পরিস্থিতিতে শুধু ব্যাংকে নতুন অর্থ ঢেলে সমস্যার সমাধান করা যথেষ্ট নয়। প্রথমে জানতে হবে প্রকৃত ক্ষতি কত, কোন সম্পদ বাস্তবে কতটা মূল্যবান এবং কোন ব্যাংক আর্থিকভাবে টেকসই। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী মূলধন পুনর্গঠন করতে হবে। আইএমএফও একটি ব্যাপক ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাংক সংস্কার কৌশলের অংশ হিসেবে সম্পদের মান যাচাই, প্রকৃত মূলধন ঘাটতি নির্ধারণ এবং দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন ও নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
সুশাসনের সংস্কার ছাড়া অর্থ ঢেলে লাভ নেই। ব্যাংকের আর্থিক সংকটের সঙ্গে সুশাসনের সম্পর্ক সরাসরি। একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ অনুমোদন কাঠামো যদি যথাযথভাবে জবাবদিহিমূলক না হয়, তাহলে মূলধন বাড়িয়েও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি কমানো যায় না।
পরিচালকদের যোগ্যতা ও উপযুক্ততা যাচাই, স্বার্থের সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের ঋণে কঠোর সীমা এবং শীর্ষ ব্যবস্থাপনার পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা যেন যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে ঋণের সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালের মূল্যায়নে দুর্বল করপোরেট সুশাসন, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দুর্বলতা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার ঝুঁকিকে ব্যাংকিং খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ব্যাংকিং খাতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অর্থ শুধু অনিয়ম ধরা পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়। কোনো ব্যাংকের সমস্যা বড় হওয়ার আগেই তার লক্ষণ শনাক্ত করা দরকার।
এ কারণে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন ব্যাংকে মূলধনের ঝুঁকি বেশি, কোথায় খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়ছে, কোন ব্যাংকে সংশ্লিষ্ট পক্ষের ঋণ অস্বাভাবিক এবং কোথায় তারল্যচাপ তৈরি হচ্ছে—এসব সূচক একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে আগেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির দিকে অগ্রসর হয়েছে। আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০টি ব্যাংকের ওপর ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির পরীক্ষামূলক পরিদর্শন সম্পন্ন হয়েছে, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রায় ৪৯ শতাংশ সম্পদের আওতায় ছিল। এই ব্যবস্থা পুরো খাতে কার্যকর করা গেলে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা আরও প্রতিরোধমূলক হতে পারে।
সব ব্যাংককে যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখার নীতি দীর্ঘমেয়াদে আমানতকারী বা অর্থনীতি—কোনোটির জন্যই কার্যকর নয়। একটি ব্যাংক যদি বাস্তব অর্থে অকার্যকর হয়ে পড়ে, তাহলে তাকে কীভাবে পুনর্গঠন বা প্রয়োজনে নিষ্পত্তি করা হবে, তার সুস্পষ্ট কাঠামো থাকতে হবে।
২০২৫ সালের মে মাসে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করা হয়, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের নিষ্পত্তি ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নতুন ক্ষমতা পায়। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, এই কাঠামোর অধীনে পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে নতুন ইসলামী ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল। এক্ষেত্রে ব্যাংক একীভূতকরণ একটি সম্ভাব্য হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু এটি নিজে কোনো সমাধান নয়। একটি দুর্বল ব্যাংকের খারাপ সম্পদ অন্য একটি ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে স্থানান্তর করলেই সমস্যা শেষ হয় না।
তাই একীভূতকরণের আগে সম্পদের প্রকৃত মূল্য, খেলাপি ঋণ, মূলধনের ঘাটতি এবং ভবিষ্যৎ পরিচালন ব্যয় নিরূপণ করতে হবে। আইএমএফও ইঙ্গিত দিয়েছে যে প্রকৃত আর্থিক অবস্থা যাচাই ও প্রয়োজনীয় ভারসাম্য রক্ষা ছাড়া সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক একীভূত করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। প্রয়োজনে সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ আলাদা ব্যবস্থাপনার জন্য সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি বা অনুরূপ কাঠামো ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে তার লক্ষ্য হতে হবে প্রকৃত ক্ষতি স্বীকার করে সমস্যাগ্রস্ত সম্পদের পুনরুদ্ধার—ক্ষতি আড়াল করা নয়।
সাধারণ আমানতকারী ব্যাংকের আর্থিক বিবরণী পড়ে সিদ্ধান্ত নেন না। তিনি বিশ্বাস করেন, তাঁর সঞ্চয় নিরাপদ। সেই বিশ্বাস রক্ষার জন্য কার্যকর আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা অপরিহার্য।
বাংলাদেশে আমানত সুরক্ষার সীমা ১ লাখ টাকা থেকে ২ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আমানত সুরক্ষা কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো ব্যাংক সমস্যায় পড়লে সুরক্ষিত আমানত দ্রুত স্থানান্তর বা পরিশোধের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা যায়।
২০২৬ সালের জুনে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের আর্থিক খাত শক্তিশালী করার জন্য ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের Financial Sector Support Project II অনুমোদন করেছে। প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য হলো ছোট আমানতকারীর সুরক্ষা, আমানত সুরক্ষা তহবিলের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যাংক পুনর্গঠন ও নিষ্পত্তির কাঠামো উন্নত করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা আধুনিকায়ন করা।
এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমানতকারীর আস্থা বাড়ানোর জন্য শুধু আইন বা তহবিল যথেষ্ট নয়। একজন গ্রাহককে সহজ ভাষায় জানতে হবে—ব্যাংক সমস্যায় পড়লে তাঁর অর্থের কত অংশ সুরক্ষিত, কীভাবে দাবি করতে হবে এবং কত দ্রুত অর্থ ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের ক্ষত সারাতে খেলাপি ঋণ আদায় অপরিহার্য। তবে সব খেলাপিকে একই চোখে দেখা উচিত নয়। ব্যবসায়িক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত একজন ঋণগ্রহীতা এবং জালিয়াতি বা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির মধ্যে আইনগত পার্থক্য থাকা দরকার।
অর্থঋণ আদালতের কার্যকারিতা বাড়ানো, মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমানো, জামানত বাস্তবায়ন সহজ করা এবং জালিয়াতির বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ যেন শুধু সমস্যাকে ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়ার উপায় না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
আইএমএফের মূল্যায়নে ঋণ শ্রেণীকরণ ও সংস্থান ব্যবস্থায় কঠোরতা এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুনর্গঠিত বা পুনঃতফসিল করা ঋণের প্রকৃত মান যথাযথভাবে যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়েছে।
আধুনিক ব্যাংকিংয়ে প্রযুক্তি শুধু দ্রুত লেনদেনের জন্য নয়; এটি ঝুঁকি শনাক্তকরণ ও জবাবদিহিরও শক্তিশালী মাধ্যম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৃহৎ তথ্য বিশ্লেষণ এবং স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি শনাক্তকরণ ব্যবহার করে অস্বাভাবিক ঋণপ্রবাহ, সন্দেহজনক লেনদেন ও সম্ভাব্য অর্থপাচারের সংকেত দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। বড় ঋণের ক্ষেত্রে ঋণের অর্থ কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে, তার তথ্যভিত্তিক নজরদারিও আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে।
তবে প্রযুক্তিকে কোনো জাদুকরী সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়। তথ্যের মান দুর্বল হলে উন্নত প্রযুক্তিও ভুল ফল দিতে পারে। তাই প্রথমে ব্যাংকের তথ্যব্যবস্থাকে নির্ভরযোগ্য করতে হবে, তারপর সেই তথ্যকে কেন্দ্রীয় তদারকি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের প্রকল্পে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো আধুনিকায়ন, সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলা এবং তথ্য ও বিশ্লেষণ সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
ব্যাংকিং সংকটে গুজব অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে। কোনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে আতঙ্কিত হয়ে একসঙ্গে অনেক গ্রাহক অর্থ উত্তোলনের চেষ্টা করলে তারল্যচাপ আরও বাড়তে পারে।
তাই ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার যোগাযোগব্যবস্থা হতে হবে দ্রুত, নির্ভরযোগ্য এবং সাধারণ মানুষের বোধগম্য। সংকটের সময় তথ্য গোপন না করে বাস্তব পরিস্থিতি, করণীয় এবং আমানতকারীর সুরক্ষা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দিতে হবে। আস্থা তৈরি হয় তখনই, যখন প্রতিষ্ঠান কঠিন সময়েও সত্য তথ্য জানায়।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের লক্ষ্য শুধু খেলাপি ঋণ কমানো বা কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে পুনর্গঠন করা হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে তিনটি বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত হয়—আমানতকারীর নিরাপত্তা, ব্যাংকের আর্থিক স্থায়িত্ব এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ। এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে সংস্কার অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
আমানতকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু ব্যাংককে অতিরিক্ত ঝুঁকিবিমুখ করে ফেললে উদ্যোক্তা ও ব্যবসা অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হবে। আবার দ্রুত ঋণপ্রবাহ বাড়াতে গিয়ে যদি দুর্বল যাচাই করা হয়, তাহলে নতুন করে খেলাপি ঋণের চাপ তৈরি হবে।
জুন ২০২৬-এ বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৪.৪৭ শতাংশে নেমে আসা দেখায় যে বর্তমান সমস্যাটি শুধু ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার নয়; ঋণের চাহিদা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গেও এটি যুক্ত। সুতরাং ভবিষ্যতের ব্যাংকিং নীতি হতে হবে গুণগত ঋণ, শক্তিশালী মূলধন, কঠোর সুশাসন এবং স্বচ্ছ তদারকির সমন্বয়।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করতে একটি ধারাবাহিক সংস্কার পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রথম ধাপে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকগুলোর সম্পদের প্রকৃত মান যাচাই করতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে প্রকৃত মূলধন ঘাটতি নিরূপণ করে ব্যাংকভিত্তিক পুনর্গঠন পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। তৃতীয় ধাপে দুর্বল কিন্তু কার্যকর ব্যাংককে পুনর্গঠন এবং অকার্যকর ব্যাংককে সুশৃঙ্খলভাবে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এর পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি, সংশ্লিষ্ট পক্ষের ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, আমানত সুরক্ষা, জরুরি তারল্য সহায়তা এবং খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে।
আইএমএফের ২০২৬ সালের মূল্যায়নেও একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সমন্বিত ব্যাংকিং সংস্কার কৌশলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে আর্থিক খাতের প্রকৃত ক্ষতি নিরূপণ, মূলধন ঘাটতি নির্ধারণ, ব্যাংক পুনর্গঠন ও নিষ্পত্তি এবং আমানতকারীর সুরক্ষা একই কাঠামোর অংশ।
বিশ্বব্যাংকের ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের Financial Sector Support Project II-ও এই সংস্কারকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়ার জন্য আমানত সুরক্ষা, ব্যাংক নিষ্পত্তি, জরুরি তারল্য সহায়তা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি এবং তথ্যপ্রযুক্তি সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট গভীর। খেলাপি ঋণ বেড়েছে, কিছু ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হয়েছে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ধীর হয়েছে এবং সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কিন্তু সংকট যত বড়ই হোক, এটি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্ট করেছে।
বিশ্বব্যাংকের আর্থিক খাত সহায়তা, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির উদ্যোগ এবং আইএমএফের ব্যাংক পুনর্গঠন ও আর্থিক নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করার সুপারিশ—সবগুলোই দেখায় যে ব্যাংকিং খাতকে শুধু সাময়িক সহায়তা দিয়ে টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে কাঠামোগত সংস্কারের দিকে এগোতে হবে।
তবে সংস্কারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে সাধারণ মানুষের আস্থায়। একজন আমানতকারী যদি নিশ্চিন্তে ব্যাংকে টাকা রাখতে পারেন, উদ্যোক্তা যদি ন্যায্য শর্তে ঋণ পান, ব্যাংকার যদি পেশাগত স্বাধীনতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং অনিয়ম হলে নিয়ন্ত্রক দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারেন—তবেই একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। ব্যাংকের মূলধন টাকা দিয়ে মাপা যায়। খেলাপি ঋণের পরিমাণ হিসাব করা যায়। মূলধন ঘাটতিও নির্ধারণ করা যায়। কিন্তু আস্থার মূল্য কোনো হিসাবের খাতায় লেখা থাকে না।
সেই আস্থা হারাতে সময় লাগে না, কিন্তু ফিরিয়ে আনতে লাগে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দক্ষতা এবং ধারাবাহিক সংস্কার। তাই বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের আগামী দিনের মূলনীতি হওয়া উচিত—ক্ষত আড়াল নয়, প্রকৃত নির্ণয়; সাময়িক জোড়াতালি নয়, কাঠামোগত সংস্কার; এবং সবার আগে আমানতকারীর আস্থা। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা তার ভল্টে থাকা অর্থ নয়—মানুষের মনে থাকা বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস পুনর্গঠনই হবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূলধন পুনর্গঠন

