গত বছর জুন মাসের কথা। তখন গ্রীষ্মের শুরু। অগ্রণী ব্যাংক হঠাৎ করেই সারা দেশে তাদের সব এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট বন্ধ করে দেয়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলেছিল, ‘সাময়িক’ বন্ধ। প্রায় সাড়ে ৫ মাস পার হয়ে গেলেও সেই ‘সাময়িক’ বন্ধ এখনও স্থায়ী হয়ে আছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১০ লাখের বেশি গ্রাহক, বিপাকে পড়েছেন ৫৬৭ জন উদ্যোক্তা, আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান।
সরকারি এই ব্যাংকটির এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম কিন্তু কোনো ছোটখাটো উদ্যোগ ছিল না। ১০ বছর ধরে এটি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সফল এজেন্ট ব্যাংকিং সেবাগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ছিল। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সারা দেশে প্রায় সাড়ে ১০ লাখ নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল, জমা পড়েছিল প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা, আর রেমিট্যান্স এসেছিল ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রতিটি আউটলেট চালাতে উদ্যোক্তাদের মাসে ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা খরচ হতো। এখন সেটা তাদের ব্যক্তিগত বিনিয়োগের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এজেন্ট ব্যাংকিং আসলে কী? সহজ ভাষায় বললে, এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে ব্যাংকের শাখায় না গিয়ে স্থানীয় দোকানে বা কমিউনিটি সেন্টারে গিয়েও লেনদেন করা যায়। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার মানুষের জন্য এটি ছিল এক আশীর্বাদ। যারা স্বাক্ষর করতে জানেন না, তাদের জন্য আঙুলের ছাপ দিয়েই লেনদেনের সুযোগ ছিল। অগ্রণী ব্যাংকের এই নেটওয়ার্কে ৯৫০টি শাখার মাধ্যমে এসব গ্রাহককে সেবা দিতে বলা হলেও, অনেকের জন্য সেই শাখাগুলো দূরবর্তী ও দুর্গম।
আসলে ২০২৫ সালের জুনে অগ্রণী ব্যাংক তাদের টেকনোলজি ও নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা অংশীদার ‘দুয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড’-এর সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে। এর পরপরই সব আউটলেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু উদ্যোক্তারা বলছেন, এটি শুধু একটি চুক্তি বাতিলের ঘটনা নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও গভীর জটিলতা।
সংবাদ সম্মেলনে উদ্যোক্তাদের পক্ষে মো. আবু সাইদ বলেন, প্রথমে ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তির অজুহাত দেখিয়ে ২০২৩ সাল থেকে বিল-কমিশন বন্ধ করে দেয়। এরপর পুরো ব্যবসাই বন্ধ করে দেয়। আর এখন আদালতের অজুহাত দেখিয়ে সাড়ে ৫ মাস ধরে লাখো গ্রাহকের সেবা বন্ধ রেখেছে। তাদের অভিযোগ, ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও জেনারেল ম্যানেজার শুধু তাদের ব্যক্তিগত এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে একটি সফল ব্যবসাকে ধ্বংস করে দিচ্ছেন।
এই সংকট কিন্তু শুধু উদ্যোক্তাদেরই নয়, পুরো এজেন্ট ব্যাংকিং খাতকে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে এজেন্ট ও আউটলেটের সংখ্যা কমেছে, যার প্রধান কারণ অগ্রণী ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এজেন্টের সংখ্যা কমেছে ৪.৩ শতাংশ। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় এই পতন বেশি ৪.৪ শতাংশ।
তবে একটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সংকটের মধ্যেও এজেন্ট ব্যাংকিং খাতে আমানত, ঋণ ও লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১৮.১ শতাংশ বেশি। এর মানে, মানুষের আস্থা কিন্তু এই খাতে রয়েছে। শুধু অগ্রণী ব্যাংকের সিদ্ধান্তই এই প্রবৃদ্ধিতে тормоз এনেছে।
এজেন্ট ব্যাংকিং কিন্তু বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। ৩০টি তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে ১৫ হাজারের বেশি এজেন্ট গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন। অগ্রণী ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি ব্যাংকের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয় এটা লক্ষাধিক গ্রামীণ মানুষের আর্থিক সেবার অধিকারকে প্রভাবিত করছে।
উদ্যোক্তারা এখন চারটি দাবি নিয়ে সরকারের দরজায় দাঁড়িয়েছেন। প্রথমত, অগ্রণী ব্যাংক সব বকেয়া বিল-কমিশন ও ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করে অবিলম্বে এজেন্ট সার্ভার চালু করুক। দ্বিতীয়ত, হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়ন করুক এবং আপিল বিভাগে তাদের আপত্তি প্রত্যাহার করুক। তৃতীয়ত, এই সংকটের জন্য দায়ী চেয়ারম্যানের পদত্যাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনা হোক। আর চতুর্থত, আদালতে চলমান আরবিট্রেশন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করা হোক।
একজন উদ্যোক্তার ভাষায়, ‘আমরা কি কোনো অপরাধ করেছি? অপরাধ না করলে আমাদের জীবিকা কেন বন্ধ থাকবে?’ এই প্রশ্ন হয়তো অনেকের মনে। উত্তরটা খোঁজার চেষ্টা করছে উদ্যোক্তারা। তাঁরা বলছেন, তাঁরা সংঘাত চান না, সমাধান চান; আন্দোলন নয়, ন্যায়বিচার চান। তাঁরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসতেও প্রস্তুত।
কিন্তু সময় কিন্তু কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সাড়ে ৫ মাস ধরে একটি সফল ব্যবসা থমকে আছে। লাখ লাখ গ্রাহক তাদের নিত্যদিনের আর্থিক সেবা থেকে বঞ্চিত। হাজার হাজার পরিবারের আয়ের উৎস শুকিয়ে গেছে। এই সংকটের সমাধান এখন শুধু উদ্যোক্তাদের দাবি নয় এটা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অগ্রযাত্রার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

