বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স সংগ্রহের ক্ষেত্রে জুন মাসের পরিসংখ্যান তাদের জন্য কিছুটা উদ্বেগের বার্তা দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেশে এসেছে ৪৪৮ মিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয়, যা এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় ২৭ শতাংশ কম।
শুধু অর্থের পরিমাণ কমেনি, মোট ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশীদারত্বও উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে গেছে। জুনে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে আসা মোট প্রবাসী আয়ের মাত্র ১৬ শতাংশ পেয়েছে ইসলামী ব্যাংকগুলো। এক বছর আগে একই সময়ে এই হার ছিল ২২ শতাংশ। এমনকি চলতি বছরের মে মাসেও ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশ ছিল ১৯ শতাংশ।অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে প্রবাসী আয় সংগ্রহে তাদের অংশ আরও কমেছে।
ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিপরীতে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো জুনে প্রবাসী আয় সংগ্রহে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে ছিল। এক বছর আগের জুনের তুলনায় তাদের মাধ্যমে আসা প্রবাসী আয় ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
তবে মে মাসের তুলনায় জুনে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেও প্রবাসী আয় কমেছে। মে মাসে তারা পেয়েছিল ২ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার, যা জুনে ১৫ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ হলো, বছরের শুরুর দিকে ইসলামী ব্যাংকগুলো প্রবাসী আয় সংগ্রহে ভালো অবস্থান তৈরি করলেও সাম্প্রতিক সময়ে তারা সেই অংশ ধরে রাখতে পারছে না। ফলে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর হিস্যা তুলনামূলকভাবে বাড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রবাসী আয় সংগ্রহে বাজার অংশীদারত্ব হারানোর সাম্প্রতিক প্রবণতা পুরো ইসলামী ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রবাসী আয় শুধু একটি ব্যাংকের আয়-ব্যয়ের হিসাবের অংশ নয়। এর সঙ্গে ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান এবং আন্তর্জাতিক লেনদেন পরিচালনার সক্ষমতাও জড়িত।
বিদেশ থেকে আসা অর্থ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার ভিত্তি শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। সেই অর্থ ব্যবহার করে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক লেনদেনসহ বিভিন্ন প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয়। তাই কোনো ব্যাংক নিয়মিতভাবে প্রবাসী আয় সংগ্রহ করতে পারলে তার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও শক্তিশালী হয়।
এই জায়গায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক পিছিয়ে পড়াকে কেবল একটি মাসের পরিসংখ্যান হিসেবে দেখছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। গ্রাহকের আস্থা, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতার মতো বিষয়গুলোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
জুনে প্রবাসী আয় কমার পেছনে মে মাসের অস্বাভাবিক বেশি প্রবাহও একটি কারণ হতে পারে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে।
২০২৬ সালের মে মাসে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রবাসী আয় এসেছিল। ঈদের আগে পরিবারের কাছে বেশি অর্থ পাঠানোর প্রবণতার কারণে মে মাসে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। ফলে পরের মাস জুনে সেই তুলনায় আয় কম দেখা যাওয়াটা কিছুটা স্বাভাবিক।
এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতাও প্রবাসী আয় প্রবাহের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ইরান সংকটসহ ওই অঞ্চলের সাম্প্রতিক অনিশ্চয়তা বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের আয় পাঠানোর ধরণে পরিবর্তন আনতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে নয়, মোট ব্যাংক আমানতের বাজারেও ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশ কিছুটা কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের জুনে এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে। তবে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর আমানত বৃদ্ধির হার ছিল আরও বেশি। এর ফলে দেশের মোট ব্যাংক আমানতের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশ জুনে দাঁড়িয়েছে ২১ শতাংশে। এক বছর আগে এই অংশ ছিল ২২ শতাংশের বেশি।
অর্থাৎ আমানতের পরিমাণ বাড়লেও সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশ কমেছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে গ্রাহকদের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রতি আস্থা ধীরে ধীরে ফিরছে। তারল্য সহায়তার ক্ষেত্রে নজরদারি বাড়ানো, দুর্বল ব্যাংকগুলো শনাক্ত করা এবং ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে প্রশাসক নিয়োগের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এসব উদ্যোগের প্রভাব আমানতের প্রবাহে ধীরে ধীরে দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ইসলামী ও প্রচলিত ব্যাংকের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।
জুনের শেষে দেশের মোট ব্যাংক বিনিয়োগের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ছিল প্রচলিত ব্যাংকগুলোর। বাকি অংশ ছিল ইসলামী ব্যাংকগুলোর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ২৫ লাখ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এই বিনিয়োগ বেড়েছে ১২ শতাংশ।
অন্যদিকে, ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ২০২৬ সালের জুনে ৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ১২ লাখ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মাসিক হিসাবে বিনিয়োগে মাঝারি ধরনের বৃদ্ধি ব্যাংকগুলোর সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। আবার এক বছরের হিসাবে প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে ইসলামী অর্থায়নের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশেষ করে লাভ ও লোকসান ভাগাভাগির ভিত্তিতে অর্থায়নের চাহিদা এই প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এখনো নানা ধরনের চাপ রয়েছে। মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হারের ওঠানামা এবং ব্যাংক খাতে কঠোরতর নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোকে ঋণ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই পরিস্থিতিতে প্রচলিত ব্যাংকগুলোও ঋণ বিতরণ ও বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাই এখন তুলনামূলক কঠিন অর্থনৈতিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তবে ইসলামী ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে আস্থা ও বাজার অংশীদারত্ব ধরে রাখার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ প্রবাসী আয়, আমানত, রপ্তানি আয় সংগ্রহ এবং আমদানি লেনদেন—সব ক্ষেত্রেই তাদের অংশে পরিবর্তনের চিত্র দেখা যাচ্ছে।রপ্তানি আয় সংগ্রহের ক্ষেত্রেও জুনে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশ কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুনে দেশের মোট রপ্তানি আয় সংগ্রহের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশ প্রায় ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এক বছর আগে একই সময়ে এই হার ছিল ২১ শতাংশ।
অন্যদিকে, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর অংশ বেড়ে ৮১ শতাংশের বেশি হয়েছে। অর্থাৎ রপ্তানি আয় সংগ্রহের বাজারেও প্রচলিত ব্যাংকগুলো স্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছে।
আমদানি লেনদেনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যবধান দেখা গেছে। ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত মোট আমদানি পরিশোধের মাত্র ১৫ শতাংশ পরিচালনা করেছে ইসলামী ব্যাংকগুলো। বিপরীতে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর অংশ ছিল ৮৫ শতাংশ।
জুনের পরিসংখ্যান থেকে ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হতে পারে—শুধু আমানত বাড়ানো যথেষ্ট নয়, গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখাও জরুরি।
প্রবাসী আয় একটি ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রাহকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরির সুযোগ তৈরি করে। সেই বাজারে অংশ কমে গেলে ব্যাংকের সামগ্রিক অবস্থানেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
তবে জুনের ২৭ শতাংশ পতনকে এককভাবে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবেও দেখা ঠিক হবে না। মে মাসে ঈদুল আজহার আগে অস্বাভাবিক বেশি প্রবাসী আয় আসা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি—দুটিই জুনের পরিসংখ্যানে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবু এক বছরের ব্যবধানে ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রবাসী আয় সংগ্রহের অংশ ২২ শতাংশ থেকে ১৬ শতাংশে নেমে যাওয়ার বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
অর্থাৎ সামনে ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য মূল প্রশ্ন শুধু কত টাকা আমানত সংগ্রহ করা যাচ্ছে, তা নয়। বরং কীভাবে গ্রাহকের আস্থা আরও শক্তিশালী করা যায়, কীভাবে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয় সংগ্রহের বাজারে নিজেদের অবস্থান ফিরিয়ে আনা যায় এবং কীভাবে বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা আনা যায়—সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর বড় একটি অংশ রয়েছে। তাই তাদের দুর্বলতা কিংবা ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা—দুটিই পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জুনের পরিসংখ্যান সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

