গ্রামের ছোটখাটো ব্যবসাগুলোকে বড় করার স্বপ্ন দেখেন যে উদ্যোক্তা, তার জন্য হয়তো এখন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) সম্প্রতি ৫০ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার মূল লক্ষ্য দেশের মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ খাতকে শক্তিশালী করে অন্তত ২ লাখ মানুষের টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। বুধবার (১৯ আগস্ট) রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ ও মো. আনিছুর রহমান এবং এসএমই অ্যান্ড এসপিডি বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা। অন্যদিকে পিকেএসএফের পক্ষে ছিলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. আকন্দ মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম এবং সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক ড. এ কে এম নুরুজ্জামান।
এই চুক্তির পথ কিন্তু সহজে তৈরি হয়নি। গত ২৩ মে দেশে কর্মসংস্থান বেগবান করার লক্ষ্যে পিকেএসএফের মাধ্যমে বিশেষায়িত কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য এই ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারপর প্রায় তিন মাসের ব্যবধানে পিকেএসএফ দেশব্যাপী এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে।
কিন্তু এই তহবিল দিয়ে আসলে কী করা হবে? কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোতে বর্ধিত অর্থায়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে এই খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এ জন্য কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে তিনটি মূল উপাদানের সমন্বয়ে: আর্থিক পরিষেবা প্রদান, গুচ্ছ ব্যবসাভিত্তিক ভ্যালু চেইন উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে সম্ভাবনাময় ব্যবসাগুচ্ছগুলো গড়ে উঠেছে, সেগুলোর বিকাশেই বিশেষ গুরুত্ব দেবে পিকেএসএফ। ধান থেকে শুরু করে হস্তশিল্প, মৎস্য থেকে সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ যে খাতেই সম্ভাবনা আছে, সেখানেই অর্থায়ন ও সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। আর এভাবেই ধীরে ধীরে ২ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রণোদনা তহবিলটি একবার ব্যবহার করেই শেষ হবে না। এটি পরিচালিত হবে ‘আবর্তক তহবিল’ (রিভলভিং ফান্ড) হিসেবে। অর্থাৎ, একবার কোনো উদ্যোক্তাকে ঋণ দেওয়া হলে তা ফেরত আসার পর আবার নতুন উদ্যোক্তাকে দেওয়া হবে। এতে অর্থের ধারাবাহিক প্রবাহ বজায় থাকবে, যা দেশের মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ খাতকে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কিন্তু এই ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোই। দেশের মোট উদ্যোগের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মাইক্রো, কটেজ ও ছোট উদ্যোক্তারা। কিন্তু তাদের মূল সমস্যা হলো পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব। ব্যাংকগুলো প্রায়ই এসব উদ্যোক্তাকে ঋণ দিতে দ্বিধাবোধ করে। এই তহবিল সেই বাধাই দূর করার চেষ্টা করছে। শুধু অর্থায়ন নয়, পাশাপাশি ব্যবসায়িক দক্ষতা ও প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে, যাতে উদ্যোক্তারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন।
এই চুক্তি নিঃসন্দেহে দেশের মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ খাতের জন্য একটি মাইলফলক। ৫০ হাজার কোটি টাকার এই তহবিল যদি সঠিকভাবে কাজে লাগে, তাহলে শুধু ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানই হবে না, গ্রামীণ অর্থনীতিও চাঙ্গা হবে। আর সেই অর্থনীতি যখন শক্তিশালী হবে, তখন তার সুফল পৌঁছাবে প্রতিটি ঘরে। এখন শুধু অপেক্ষা, এই বিশাল তহবিল কীভাবে মাঠ পর্যায়ে রূপায়িত হয় সেটাই দেখার বিষয়।

